সকাল থেকে রাত - চা, জলখাবার, দুপুরের রান্না, বিকেলের টিফিন, রাতের রুটি। রান্নাঘরে দাঁড়িয়েই কাটছে দিনের অর্ধেকটা? অজান্তেই কি খেসারত দিচ্ছে হাঁটু-কোমর? কেন হয় এই যন্ত্রণা, কীভাবে মুক্তি পাবেন, জেনে নিন বিস্তারিত।

সকাল ৬টায় চা দিয়ে দিন শুরু, তারপর জলখাবার, দুপুরের ভাত-ডাল-তরকারি, বিকেলে ছেলের টিফিন, রাতে আবার রুটি। হিসেব করলে দেখা যাবে একজন গৃহবধূ দিনে গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা রান্নাঘরেই দাঁড়িয়ে কাটান। প্রথম প্রথম কিছু মনে হয় না, কিন্তু ৩৫ পেরোতেই শুরু হয় সমস্যা। সন্ধ্যা হলেই হাঁটুতে টনটন, কোমর যেন ভেঙে আসছে, পায়ের গোড়ালি ফুলে ঢোল। অনেকেই ভাবেন, বয়স হচ্ছে তাই ব্যথা। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, এর আসল কারণ লুকিয়ে আছে আপনার রান্নাঘরের দাঁড়ানোর অভ্যাসেই।

টানা দাঁড়িয়ে থাকলে শরীরের পুরো ওজন গিয়ে পড়ে হাঁটু, কোমর এবং পায়ের পাতার উপর। দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ের শিরায় রক্ত জমতে থাকে, রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। পেশী শক্ত হয়ে যায়, যাকে বলে মাসল ফ্যাটিগ। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি হয়, কারণ তাঁদের হাঁটুর জয়েন্ট স্বাভাবিকভাবেই পুরুষদের তুলনায় বেশি নমনীয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও দুটি বড় ভুল। এক, খালি পায়ে শক্ত টাইলস বা মার্বেলের মেঝেতে দাঁড়ানো। এতে পায়ের পাতার নিচের পর্দায় প্রদাহ হয়, যাকে চিকিৎসার ভাষায় বলে প্লান্টার ফ্যাসাইটিস। সকালে ঘুম থেকে উঠে পা ফেলতেই তীব্র ব্যথা এরই লক্ষণ। দুই, রান্নার স্ল্যাবের ভুল উচ্চতা। স্ল্যাব যদি খুব নিচু হয়, তাহলে সারাক্ষণ কোমর ঝুঁকিয়ে কাজ করতে হয়। আর উঁচু হলে কাঁধে চাপ পড়ে। দুটোই লাম্বার স্পন্ডাইলোসিস এবং সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

তাহলে উপায় কী? রান্না তো আর বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু ছোট কিছু পরিবর্তনেই এই ব্যথা থেকে ৯০% মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

প্রথমত, রান্নাঘরের স্ল্যাবের সামনে একটি অ্যান্টি-ফ্যাটিগ ম্যাট বা মোটা নরম পাপোশ রাখুন। বিদেশে এটি খুবই জনপ্রিয়। শক্ত মেঝের তুলনায় এই ম্যাট পায়ের উপর চাপ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত, রান্নাঘরে একটি উঁচু টুল রাখুন। সব কাজ দাঁড়িয়ে করার দরকার নেই। আনাজ কাটা, মশলা গোছানো, আটা মাখার মতো কাজ বসে করুন। প্রতি ২০ মিনিট অন্তর ২ মিনিট বসে বা একটু হেঁটে নিন। এতে রক্ত সঞ্চালন ঠিক থাকবে।

তৃতীয়ত, কখনওই খালি পায়ে রান্নাঘরে দাঁড়াবেন না। নরম সোলের হালকা স্লিপার ব্যবহার করুন, যা পায়ের আর্চকে সাপোর্ট দেবে।

চতুর্থত, রান্নার ফাঁকেই ছোট স্ট্রেচিং করুন। ৩০ সেকেন্ড পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ান, কোমর হালকা ঘোরান। রান্না শেষে ৫ মিনিট পা দুটো দেয়ালে তুলে দিয়ে শুয়ে থাকুন। এতে পায়ের ফোলা ভাব ও ক্লান্তি দ্রুত কমে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, স্ল্যাবের উচ্চতা ঠিক করুন। আদর্শ উচ্চতা হল আপনার কনুই থেকে ১০-১৫ সেন্টিমিটার নিচে, যাতে হাত ৯০ ডিগ্রি কোণে থাকে এবং কোমর ঝুঁকতে না হয়।

মনে রাখবেন, সংসার সামলাতে গিয়ে নিজের শরীরকে অবহেলা করলে চলবে না। রান্নাঘর আপনার সংসারের হার্ট, কিন্তু সেই হার্টকে সচল রাখতে আপনার হাঁটু-কোমর ভালো থাকাটা জরুরি। আজ থেকেই এই ছোট পরিবর্তনগুলো শুরু করুন।