আমি ফিলিপস ২৮০০ ওয়াট নো বার্নস স্টিম আয়রনের (DST6130/40) রিভিউ করেছি। অপ্টি-টেম্প প্রযুক্তির সাহায্যে এটি কাপড়ে পোড়া দাগ লাগতে দেয় না। কিন্তু এত দাম দিয়ে এই গ্যাজেট কেনা কি সত্যিই লাভজনক?

আমি ভয়ে নখ কামড়াচ্ছিলাম। অন্যমনস্ক হয়ে ইস্ত্রিটা কাপড়ের ওপর রেখেই ভুলে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কাপড়টা বোধহয় পুড়েই গেল। বউয়ের বকুনি খাওয়ার ভয়ে তখন আমার হাত-পা ঠান্ডা। পরে খেয়াল করলাম, ইস্ত্রিটা বউয়ের সবচেয়ে দামি আর শখের সিল্কের শাড়ির ওপর রাখা! ভয়ে ভয়ে ইস্ত্রিটা তুললাম। কিন্তু অবাক কাণ্ড, শাড়ির কিছুই হয়নি!

সামনেই উৎসবের মরশুম। আর এই সময়েই এমন বিপদ ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। আপনি হয়তো তাড়াহুড়ো করে ইস্ত্রি করছেন। হঠাৎ কেউ ডাকল বা অতিথি চলে এল। আপনিও গল্পে মেতে উঠলেন। আর এদিকে আপনার প্রিয় পোশাকের ওপর ইস্ত্রিটা বসানোই থাকল! ফিলিপস ২৮০০ ওয়াট নো বার্নস স্টিম আয়রন (DST6130/40) থাকলে এই টেনশন একেবারেই গায়েব হয়ে যায়।

উৎসবের দিনে এই নিশ্চিন্ত থাকাটা যে কতটা শান্তির, তা একবার ভেবে দেখুন। সামনেই বিয়ের মরশুম। কাউকে উপহার দেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো জিনিস আর হতেই পারে না। এই ব্যস্ত সময়ে নিজেকে বা প্রিয়জনকে নিশ্চিন্ত করার জন্য এটি সেরা উপহার।

উৎসবের মরশুম তো শুরু হয়েই গেছে। তাই এই স্টিম আয়রন সম্পর্কে আপনাদের বিস্তারিত জানাই। তাহলেই বুঝতে পারবেন, এটি আপনার কেনা উচিত কি না।

কী কী প্রযুক্তি রয়েছে এতে?

পোশাক না পুড়িয়েও কীভাবে এটি এত সুন্দর ইস্ত্রি করে, তা বুঝতে গেলে ফিলিপসের এই দারুণ প্রযুক্তিগুলো সম্পর্কে জানতে হবে।

২৮০০ ওয়াটের শক্তিশালী পারফরম্যান্স

এটি খুব দ্রুত গরম হয়ে যায়। তাই সকালের তাড়াহুড়োর সময় আপনাকে ইস্ত্রি গরম হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

অপ্টি-টেম্প প্রযুক্তি

এই আয়রনের 'নো বার্নস গ্যারান্টি'-র আসল রহস্য হলো এই প্রযুক্তি। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাপড়ের ধরন বুঝে তাপমাত্রা ঠিক করে নেয়। তাই মোটা ডেনিম ইস্ত্রি করার পরপরই আপনি নিশ্চিন্তে পাতলা সিল্কের কাপড় ইস্ত্রি করতে পারবেন। বারবার তাপমাত্রা বদলানোর কোনো ঝামেলা নেই।

প্রচুর স্টিম বা বাষ্প

রোজকার জামাকাপড়ের ভাঁজ দূর করতে এটি প্রতি মিনিটে ৫০ গ্রাম করে একটানা স্টিম দেয়। আর খুব জেদি ভাঁজ দূর করতে এতে ২২০ গ্রামের আল্ট্রা স্টিম বুস্ট রয়েছে, যা মোটা কাপড়ের ভাঁজও অনায়াসে সমান করে দেয়।

৬-লেয়ার স্টিমগ্লাইড প্লাস সোলপ্লেট

টাইটানিয়াম লেয়ার দিয়ে তৈরি এই সোলপ্লেট সাধারণ আয়রনের চেয়ে ৫ গুণ বেশি টেকসই। এটি কাপড়ের ওপর খুব মসৃণভাবে ঘোরে, এতে সহজে দাগ পড়ে না। এমনকি ঝুলন্ত জামাকাপড় বা পর্দা ইস্ত্রি করার জন্য এটি খাড়াভাবেও ব্যবহার করা যায়।

স্মার্ট সেফটি এবং মেইনটেন্যান্স

ব্যবহার না করলে এটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায় (অটো শাট-অফ)। কম তাপমাত্রায় জল লিক করা আটকাতে এতে ড্রিপ-স্টপ প্রযুক্তি রয়েছে। এছাড়া আয়রনের ভেতরের ময়লা পরিষ্কার করে স্টিম পারফরম্যান্স ঠিক রাখতে এতে একটি বিল্ট-ইন ক্যাল্ক-ক্লিন স্লাইডারও দেওয়া হয়েছে।

'নো বার্নস' গ্যারান্টির আসল সত্যিটা কী?

এখানে একটা খুব জরুরি কথা পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো। 'নো বার্নস গ্যারান্টি' শুধুমাত্র সেইসব কাপড়ের জন্যই প্রযোজ্য, যেগুলো ইস্ত্রি করা যায়।

এর মানে হলো, আপনার পাতলা সিল্ক, মোটা ডেনিম বা লিনেন কাপড় একদম সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু সাধারণ বুদ্ধিও তো কাজে লাগাতে হবে! আপনার টি-শার্টে যদি রাবারের লোগো বা প্লাস্টিকের প্রিন্ট থাকে, অথবা কাপড়ে যদি 'ডু নট আয়রন' ট্যাগ থাকে, তাহলে তাপে সেই প্রিন্ট গলে যাবেই। আয়রনটা স্মার্ট ঠিকই, কিন্তু প্লাস্টিককে তাপ-প্রতিরোধী করার উপায় সে এখনও শেখেনি।

আমার পরামর্শ কী? গ্রাফিক টি-শার্ট ইস্ত্রি করার সময় সাধারণ নিয়ম মেনে চলুন। টি-শার্ট উল্টো করে ভেতরের দিকটা ইস্ত্রি করুন। এই ছোট্ট অভ্যাসে আপনার প্রিন্টও ভালো থাকবে, আর এই দারুণ আয়রনটা কাপড়ের ভাঁজও দূর করে দেবে।

এত বেশি স্টিম যে নিমেষেই জল শেষ হয়ে যায়

এত ভালো স্টিম পাওয়ার জন্য একটা ছোট দাম তো চোকাতেই হবে। এই আয়রন প্রচুর জল টানে।

এই আয়রনের স্টিম পারফরম্যান্স এতটাই ভালো যে মাত্র কয়েক মিনিটেই জামাকাপড় ইস্ত্রি হয়ে যায়। কিন্তু স্টিম এত বেশি বেরোয় যে, ৩০০ এমএল-এর জলের ট্যাঙ্ক খুব তাড়াতাড়ি খালি হয়ে যায়।

সম্প্রতি আমার সাথেই এমনটা হয়েছে। সকালে শার্ট ইস্ত্রি করব ভেবে আগের দিন রাতেই আয়রনটা রেখেছিলাম। সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করছিলাম। তখন দেখি আয়রনে এক ফোঁটাও জল নেই, কারণ আগেরবার ইস্ত্রি করার সময়ই সব জল শেষ হয়ে গিয়েছিল। কাজ সারার জন্য আমাকে তাড়াতাড়ি বড় মুখওয়ালা ছিদ্র দিয়ে আবার জল ভরতে হয়েছিল।

জলের ট্যাঙ্কের সাইজটা খুব একটা বড় সমস্যা নয়। তবে এই স্টিম আয়রনের পারফরম্যান্স যেহেতু অসাধারণ, তাই এই বিষয়টা মাথায় রাখা ভালো।

এত দাম দিয়ে কেনা কি ঠিক হবে?

বর্তমানে ফিলিপসের ওয়েবসাইটে এর দাম প্রায় ১০,৪৯৯ টাকা। হ্যাঁ, যেখানে ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকার মধ্যে ভালো আয়রন পাওয়া যায়, সেখানে ১০,৪৯৯ টাকা খরচ করাটা বেশ বড় ব্যাপার।

সাধারণ আয়রনের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি দাম দিতে যে কারও একটু দ্বিধা হতেই পারে। কিন্তু আমি নিজে ব্যবহার করে যে দারুণ অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তার কোনো তুলনাই হয় না।

একবার অন্য দিকটা ভেবে দেখুন। বংশপরম্পরায় পাওয়া একটা দামি সিল্কের শাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে তার ক্ষতিপূরণ কি টাকা দিয়ে হয়? এই আয়রন আপনাকে সম্পূর্ণ মানসিক শান্তি দেবে। দামি জামাকাপড় পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে আপনি যে কত হাজার হাজার টাকা বাঁচাতে পারবেন, তা একবার ভেবে দেখুন।

শেষ কথা

ইস্ত্রি করাটা একটা খুব ঝক্কির কাজ। আমরা অনেক সময় একে 'মজবুরি' বা বাধ্য হয়ে করা কাজ বলি, যা কেউ মন থেকে করতে চায় না। কেউ যদি আপনার হয়ে একটা সাধারণ জামাও ইস্ত্রি করে দেয়, তাকে অনেক ধন্যবাদ জানানো উচিত। কারণ আপনি জানেন কাজটা কতটা বিরক্তিকর।

আমার অবস্থাও ঠিক একই রকম ছিল। কিন্তু কাজটা সহজ করার জন্য আমার শুধু একটা ভালো জিনিসের দরকার ছিল।

ফিলিপস ২৮০০ ওয়াট নো বার্নস স্টিম আয়রন (DST6130/40) পুরো ধারণাটাই বদলে দিয়েছে। জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় ছাড়াই এটি মাত্র কয়েক মিনিটে সবচেয়ে কোঁচকানো কাপড়কেও একদম নতুনের মতো করে দেয়।

এটি বিরক্তিকর 'মজবুরি'-কে একটা দ্রুত এবং আনন্দদায়ক কাজে বদলে দেয়। ফিলিপস এখানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অসাধারণ নিদর্শন তৈরি করেছে। আর হ্যাঁ, এটি কেনার জন্য আমি অবশ্যই সুপারিশ করব।

আমার রেটিং: ৪/৫ (বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: হিমাঙ্ক ত্রিপাঠী কনজিউমার টেকনোলজি, লাইফস্টাইল এবং অটোমোবাইল ক্ষেত্রের একজন বিশেষজ্ঞ। এখানে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব।)