উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ে ৫০২৯ মিটার উচ্চতায় আছে এক ছোট্ট হিমবাহ হ্রদ, নাম রূপকুণ্ড। গ্রীষ্মে বরফ গলেই হ্রদের জলে আর পাড়ে ভেসে ওঠে ৩০০-র বেশি মানুষের কঙ্কাল। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ রেঞ্জার প্রথম দেখার পর থেকেই রহস্য, এরা কারা? কোনো যুদ্ধে মরা সৈনিক, নাকি মহামারীর শিকার?

হিমালয়ের কোলে লুকিয়ে থাকা একটা নীল জলের হ্রদ। চারপাশে বরফ ঢাকা চূড়া, নিস্তব্ধ প্রকৃতি। কিন্তু জুন মাসে বরফ গললেই এই স্বর্গের চেহারা বদলে যায়। হ্রদের স্বচ্ছ জলের তলায় আর পাথরের খাঁজে খাঁজে দেখা যায় মানুষের মাথার খুলি, হাড়, পায়ের পাতা। এই হল রূপকুণ্ড, যাকে সবাই চেনে ‘স্কেলেটন লেক’ বা ‘কঙ্কাল হ্রদ’ নামে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০২৯ মিটার বা ১৬,৫০০ ফুট উঁচুতে এই হ্রদে ৩০০-র বেশি মানুষের কঙ্কাল কীভাবে এল, ৮০ বছর ধরে তার কোনো উত্তর ছিল না।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ফরেস্ট রেঞ্জার এইচ. কে. মাধোয়াল প্রথম কঙ্কালগুলো দেখতে পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, তাই প্রথমে ভাবা হয়েছিল এরা জাপানি সৈনিক, যারা লুকিয়ে ভারতে ঢুকতে গিয়ে মারা গেছে। পরে কার্বন ডেটিং-এ জানা যায়, হাড়গুলো অনেক পুরনো, ৯ম শতাব্দীর। এরপর একের পর এক থিওরি আসে। লোকগাথা বলে, কনৌজের রাজা যশধবল তাঁর গর্ভবতী রানি, দাসদাসী আর নর্তকীদের নিয়ে নন্দাদেবীর পুজো দিতে যাচ্ছিলেন। পাহাড়ি নিয়ম ভেঙে নাচ-গানের দল নিয়ে যাওয়ায় দেবী রেগে যান। তিনি ‘লোহার মতো শক্ত’ শিলাবৃষ্টি নামান, আর তাতেই গোটা দলটা মারা যায়। বিজ্ঞানীরাও পরে কঙ্কালের মাথায় গভীর ফাটল দেখে বলেন, ক্রিকেট বলের সাইজের শিলাবৃষ্টিতেই এদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

কিন্তু আসল চমক আসে ২০১৯ সালে। Nature Communications জার্নালে প্রকাশিত রিপোর্টে ৩৮টি কঙ্কালের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়। তাতে দেখা যায়, এরা সবাই একসাথে মরেনি। ২৩ জনের DNA ভারতীয় বংশোদ্ভূত, যাদের মৃত্যু ৭ম থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যে। এরা সম্ভবত তীর্থযাত্রী ছিল। কিন্তু ১৪ জনের DNA মেলানোই যাচ্ছিল না। এদের জিন পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয়, অর্থাৎ বর্তমান গ্রিস বা ক্রিট দ্বীপের মানুষের সাথে মেলে। আর এদের মৃত্যু হয়েছে অনেক পরে, ১৭-১৯ শতকে, মানে আজ থেকে মাত্র ২০০ বছর আগে। বাকি ১ জনের DNA দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার।

এখানেই সব হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে। ১৮০০ সালের দিকে একদল গ্রিক বা ভূমধ্যসাগরীয় মানুষ হিমালয়ের এত দুর্গম জায়গায় কী করতে গিয়েছিল? তারা কি ব্যবসায়ী ছিল, নাকি কোনো গুপ্তধনের খোঁজে যাওয়া অভিযাত্রী? তাদের সাথে কোনো মহিলা বা বাচ্চার হাড় পাওয়া যায়নি, সবাই পুরুষ। আবার ভারতীয় গ্রুপের মধ্যে পুরুষ-মহিলা দুইই ছিল। বিজ্ঞানীরা আরও অবাক হন এটা দেখে যে, দুই গ্রুপের মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ আলাদা। ভারতীয়রা স্থানীয় খাবার খেত, আর ভূমধ্যসাগরীয়রা মিলেট জাতীয় শস্য খেত যা ওই অঞ্চলে হয় না। অর্থাৎ তারা দল বেঁধে নিজেদের খাবার নিয়ে গিয়েছিল।

রূপকুণ্ডের রহস্য আজও পুরো সমাধান হয়নি। DNA টেস্ট একটা দরজা খুলেছে, কিন্তু আরও অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কেন দুটো সম্পূর্ণ আলাদা সময়ের, আলাদা মহাদেশের মানুষ একই হ্রদের ধারে এসে প্রাণ হারাল? শিলাবৃষ্টি কি দুবার হয়েছিল? নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল? উত্তরাখণ্ড সরকার এখন রূপকুণ্ডে যাওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। হাড় ছোঁয়া বা নিয়ে আসা আইনত দণ্ডনীয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয়ের বরফের নিচে আরও অনেক অজানা ইতিহাস চাপা পড়ে আছে। রূপকুণ্ড তারই একটা ছোট্ট নমুনা মাত্র।