মোবাইল আর স্ক্রিনের যুগে মন বড্ড অস্থির। তাই ফিরে আসছে প্রাচীন ‘ত্রাটক’ ধ্যান। একটা মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে থাকলেই নাকি কমবে স্ট্রেস, বাড়বে ফোকাস আর ভালো হবে ঘুম। জানুন এই ধ্যানের নিয়ম, উপকারিতা এবং কারা করবেন না।

ত্রাটক ধ্যান কী এবং কেন একে ‘মন ট্রেনিং’ বলা হয় জানেন কি? ত্রাটক শব্দের অর্থ হল ‘স্থির দৃষ্টি’। এটি যোগশাস্ত্রের একটি প্রাচীন শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া বা ষটকর্মের একটি অঙ্গ। এই পদ্ধতিতে চোখের পলক না ফেলে কোনো একটা নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে হয়। সবচেয়ে জনপ্রিয় হল মোমবাতির শিখা, প্রদীপের আগুন বা কালো বিন্দু। তাই একে ‘ক্যান্ডেল গেজিং মেডিটেশন’ও বলে। যোগীরা হাজার বছর ধরে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছেন মনকে এক জায়গায় স্থির করার জন্য। তাদের বিশ্বাস, নিয়মিত ত্রাটক করলে মন একাগ্র হয়, চিন্তা কমে এবং আজ্ঞা চক্র বা তৃতীয় নেত্র জাগ্রত হয়।

স্ক্রিনের যুগে হঠাৎ কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে ত্রাটক?

আজকের দিনে আমাদের মন এক মিনিটও শান্ত থাকে না। নোটিফিকেশন, রিলস, ইমেইল, কাজের ডেডলাইন - মাথা ২৪ ঘন্টা দৌড়াচ্ছে। ধ্যান-যোগ করতে গেলে মন্ত্র মনে রাখতে হয়, আসন করতে হয়, সময় লাগে। কিন্তু ত্রাটকের জন্য দরকার শুধু একটা মোমবাতি আর ১০ মিনিট। কোনো জটিলতা নেই। তাই স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে কর্পোরেট কর্মী, গৃহিণী - সবাই এখন এই সহজ পদ্ধতিটা বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে যারা অ্যাংজাইটি, ওভারথিঙ্কিং আর ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন, তারা রিপোর্ট করছেন মাত্র ৭ দিনেই ফারাক বুঝতে পারছেন। ডাক্তাররাও বলছেন, একটা পয়েন্টে ফোকাস করলে মস্তিষ্কের ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ শান্ত হয়, ফলে স্ট্রেস কমে।

ত্রাটক ধ্যানের ৫টি বড় উপকারিতা যা আপনি অবহেলা করতে পারবেন না :

প্রথমত এটি মনকে অবিশ্বাস্য রকম শান্ত করে। একটা জায়গায় দৃষ্টি স্থির রাখতে গেলে মাথার ভেতরের ১০০টা চিন্তা অটোমেটিক থেমে যায়। ফলে স্ট্রেস আর অ্যাংজাইটি অনেকটা কমে যায়। দ্বিতীয়ত এটি একাগ্রতা বাড়ায়। যাদের পড়াশোনা বা কাজে মন বসে না, তারা নিয়মিত ত্রাটক করলে কনসেনট্রেশন পাওয়ার অনেক বাড়বে বলে যোগ গুরুদের দাবি। তৃতীয়ত চোখের জন্য ভালো। চোখের পেশী মজবুত হয় এবং চোখের জ্যোতি বাড়ে। তবে এখানে সাবধানতা জরুরি। চতুর্থত ঘুমের সমস্যা দূর করে। রাতে শোওয়ার আগে মাত্র ৫ মিনিট করলেই মন শান্ত হয়ে যায়, ফলে অনিদ্রা কমে। পঞ্চমত এটি আধ্যাত্মিক উন্নতিতে সাহায্য করে। যোগ অনুযায়ী এটি আজ্ঞা চক্রকে অ্যাক্টিভ করে, ফলে অন্তর্দৃষ্টি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে।

বাড়িতে বসে কীভাবে করবেন ত্রাটক ধ্যানের সঠিক পদ্ধতি?

এটা করার জন্য কোনো গুর কাছে যাওয়ার দরকার নেই। বাড়িতেই করতে পারবেন, তবে কয়েকটা নিয়ম মানতেই হবে। প্রথম ধাপে একটা শান্ত ঘর বেছে নিন। ঘরের আলো নিভিয়ে দিন যাতে শুধু মোমবাতির আলো থাকে। মেঝেতে আসন পেতে সুখাসনে বসুন। সামনে টেবিলে একটা মোমবাতি রাখুন। খেয়াল রাখবেন মোমবাতির শিখা যেন আপনার চোখের একদম সমান উচ্চতায় থাকে এবং আপনার থেকে ২-৩ ফুট দূরে থাকে। দ্বিতীয় ধাপে পিঠ সোজা করে বসে চোখের পলক না ফেলে মোমবাতির শিখার একদম মাঝের নীল অংশটার দিকে তাকিয়ে থাকুন। মন ভটকালেও রাগ করবেন না, আস্তে করে আবার ফিরিয়ে আনুন। প্রথমে ১-২ মিনিট দিয়েই শুরু করুন। তৃতীয় ধাপে যখন চোখে জল আসবে বা আর পারবেন না, তখন আস্তে করে চোখ বন্ধ করে নিন। বন্ধ চোখের সামনে শিখার যে ছবিটা ভাসবে সেটাকে দেখার চেষ্টা করুন। এটাকে বলে ‘ইনার ত্রাটক’। এটা ১-২ মিনিট করুন। শেষ ধাপে আস্তে আস্তে চোখ খুলুন। হাতের তালু ঘষে গরম করে চোখের উপর ১০ সেকেন্ড ধরে রাখুন। ধীরে ধীরে অভ্যাস হলে সময় বাড়িয়ে ১০-১৫ মিনিট পর্যন্ত করতে পারেন।

কারা এই ধ্যান করবেন না এবং কী সাবধানতা মানবেন?

যাদের মাইগ্রেন, এপিলেপ্সি, গ্লুকোমা বা রেটিনার কোনো গুরুতর সমস্যা আছে তারা অবশ্যই প্রথমে ডাক্তারের সাথে কথা বলে নেবেন। কখনোই জোর করে চোখের পলক আটকে রাখবেন না। চোখে অস্বস্তি হলে সাথে সাথে বন্ধ করে দিন। গর্ভবতী মহিলা এবং ১২ বছরের কম বয়সীদেরও না করাই ভালো।

ত্রাটক কোনো জাদু নয়, এটা মনকে ট্রেনিং দেওয়ার একটা বৈজ্ঞানিক উপায়। এই ডিজিটাল যুগে যখন ১০ সেকেন্ডের রিলসে আমাদের মন আটকে যাচ্ছে, তখন ১০ মিনিট একটা শিখার দিকে তাকানোই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জটাই আপনাকে ফেরাবে মানসিক শান্তি আর ফোকাস। রোজ মাত্র ১০ মিনিট ফোন দূরে রেখে ট্রাই করে দেখুন। কয়েকদিনের মধ্যেই নিজেই বুঝবেন ফারাকটা।