আলমারি ভর্তি, ফোন ভর্তি, মন ভর্তি। তবুও শান্তি নেই। সুইডেনের মানুষ বছরের পর বছর ধরে করে আসছে Döstädning। এর উদ্দেশ্য ঘর ঝাড়া নয়, নিজের জীবন আর প্রিয় মানুষদের বোঝা হালকা করা।

"এটা পরে লাগবে", "স্মৃতি জড়িয়ে আছে", "একদিন কাজে আসতেও পারে" এই তিনটে কথা বলতে বলতেই আমাদের ঘর ভরে ওঠে। আলমারির কোনায় জামা, ড্রয়ারে পুরনো বিল, ফোনে হাজারো ঝাপসা ছবি আর ব্যালকনিতে ভাঙা ফুলদানি। জিনিস বাড়ে, কিন্তু সাথে বাড়ে অশান্তি। খুঁজে পাই না, গোছাতে পারি না, আর রাতে ঘুমও আসে না ঠিক করে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

এই জঞ্জট থেকে বাঁচার জন্যই সুইডেনে বহু বছর ধরে চলে আসছে একটা অভ্যাস। নাম তার *Döstädning (দোসিতনিং’)। ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি *Swedish Death Cleaning*। নাম শুনে অনেকে ভয় পেয়ে যান। মনে হয় এটা বুঝি মৃত্যুর প্রস্তুতি। কিন্তু আসলে পুরো ব্যাপারটা উল্টো। এটা মৃত্যুর জন্য নয়, বরং বেঁচে থাকতে থাকতেই নিজের জীবনটাকে সুন্দর আর সহজ করে তোলার গল্প।

Döstädning শব্দটার মানে খুব সোজা। Dö মানে মৃত্যু আর Städning মানে পরিষ্কার করা। সুইডিশরা সাধারণত ৫০ বছর বয়সের পর থেকে ধীরে ধীরে এই কাজটা শুরু করে। তাদের ভাবনা হল দুটো। প্রথমত নিজের জন্য। চারপাশে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ভিড় কমিয়ে এখনই একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচা। দ্বিতীয়ত পরিবারের জন্য। আমি থাকতে থাকতেই যদি সব গুছিয়ে রাখি, তাহলে আমি চলে যাওয়ার পর ছেলেমেয়ে বা কাছের মানুষদের আমার ফেলে যাওয়া জিনিস ঘেঁটে মানসিক কষ্ট পেতে হবে না। মানে বিষয়টা হল বোঝা কমিয়ে যাওয়া। নিজেও হালকা থাকা আর প্রিয়জনকেও হালকা রাখা।

এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় কথা হল এখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। একদিনে গোটা বাড়ি শেষ করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং ধীরে ধীরে করতে হয়। এই সপ্তাহে শুধু রান্নাঘরের একটা ড্রয়ার খুলুন। পরের সপ্তাহে বইয়ের তাকটা ধরুন। তারপরের মাসে ওয়ারড্রব। সুইডিশরা অনেকে ২০-৩০ বছর ধরে অল্প অল্প করে করে। তাই চাপ নেওয়ার কিছু নেই।

এরপর আসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। প্রতিটা জিনিস হাতে নিয়ে নিজেকে শুধু তিনটে প্রশ্ন করুন। এটা আমি রাখব, নাকি কাউকে দিয়ে দেব, নাকি ফেলে দেব। "যদি কখনও লাগে" এই অজুহাতটা এখানে একদম চলবে না। গত এক বছরে যে জামাটা একবারও গায়ে দেননি, যে গ্যাজেটটা একবারও ব্যবহার করেননি, সেটা ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই আর লাগবে না। সাহস করে ছেড়ে দিলে দেখবেন মনটাও হালকা হয়ে যাচ্ছে।

আমরা সবাই সেন্টিমেন্টাল। দাদুর পুরনো ঘড়ি, মায়ের বিয়ের শাড়ি, কলেজের প্রথম প্রেমপত্র ফেলতে মন চায় না। Swedish Death Cleaning বলছে সব ফেলতেও হবে না। ১০টা চিঠির মধ্যে আপনার কাছে যেটা সবচেয়ে দামি সেটা ২টো রেখে দিন। বাকিগুলোর যত্ন করে ছবি তুলে একটা ফোল্ডারে সেভ করে রাখুন। জিনিস কমে যাবে কিন্তু স্মৃতি রয়ে যাবে। আবার কিছু জিনিস আছে যেগুলো আপনার পর কেউ দেখলে অস্বস্তি পাবে। যেমন পুরনো ডায়েরি, ব্যক্তিগত চিঠি বা মেডিক্যাল কাগজ। সেগুলো এখনই সময় করে নিজে দেখে নষ্ট করে ফেলুন। এটা নিজের প্রতি এবং পরিবারের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান।

অনেকে ভাবেন এটা শুধু ঘর গোছানোর টেকনিক। কিন্তু আসলে এটা একটা থেরাপি। চারপাশে যখন কম জিনিস থাকে তখন মাথার মধ্যেও ভিড় কম থাকে। অকারণ অ্যাংজাইটি, টেনশন কমে যায়। নতুন জিনিস কেনার আগে দুবার ভাবতে হয় কারণ রাখার জায়গা নেই। ফলে অকারণ খরচও কমে। সময় বাঁচে কারণ কিছু খুঁজতে হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা পরিবারের সাথে সম্পর্ক ভালো থাকে। কারণ আপনি যাওয়ার পর তাদের "এই সবের কী করব" ভেবে কষ্ট পেতে হয় না।

শুরু করবেন কীভাবে? খুব ছোট থেকে। আজ রাতে শুধু ১০ মিনিট সময় দিন। ফোনের গ্যালারি খুলে ২০টা ডুপ্লিকেট বা ঝাপসা ছবি ডিলিট করে দিন। কাল সকালে ওয়ারড্রব থেকে ৩টে এমন জামা বের করুন যেটা গত এক বছরে পরেননি। পাশের কোনো এনজিওতে দান করে দিন। এই ছোট ছোট স্টেপেই আপনি ফারাকটা বুঝতে পারবেন। কাজ শেষে মনটা কেমন ফ্রি লাগবে।

শেষে একটা কথাই বলার। Swedish Death Cleaning মানে মৃত্যুর জন্য তৈরি হওয়া নয়। এর আসল মানে হল এই সিদ্ধান্তটা নিজে নেওয়া যে আমি আমার জীবনে কী রাখতে চাই আর কী ছাড়তে চাই। জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় বোঝা নামিয়ে দিন। মনে রাখবেন কম জিনিস মানেই বেশি জায়গা। আর বেশি জায়গা মানেই বেশি শান্তি।