তপন মল্লিক: দক্ষিণ এশিয়ার ডেট্রয়েট বলে উল্লেখ করা হয় চেন্নাইকে। শহরটির পুরনো নাম মাদ্রাজ। ১৬৩৯ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি স্থায়ী উপনিবেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে যে অঞ্চলটিকে পছন্দ করল তার নাম মাদ্রাজপত্তনম। এর ঠিক দিক্ষিণপ্রান্তে ছিল আরেকটি গ্রাম; তার নাম চেন্নাপত্তনম। পরবর্তীতে মাদ্রাজপত্তনম আর চেন্নাপত্তনম একত্রিত করে ব্রিটিশরা নাম দেন মাদ্রাজ। তবে বেশ কিছুকাল পর্যন্ত স্থানীয় লোকজন নতুন অঞ্চলটিকে চেন্নাপত্তনম বা চেন্নাপুরি বলত।

১৯৯৬ সালের ২২ আগস্ট এই শহরের নাম মাদ্রাজ থেকে পরিবর্তন করে চেন্নাই করা হয়। এই নাম বদলের পিছনে কারণ ছিল। অনেকেই মাদ্রাজ শব্দটিকে পর্তুগিজ শব্দ বলে মনে করতেন। অনেকে মনে করতেন, এই শব্দটি পর্তুগিজ মাদ্র ডি সোইস নামে এক সরকারি কর্মচারীর নাম থেকে নেওয়া।  বহুকাল আগে থেকেই তিনি এই এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন। কিছু লোক মনে করে মাদ্রাজ শব্দটি তামিল ভাষার মূল শব্দ বরং চেন্নাই শব্দটি অন্য কোন ভাষা থেকে নেওয়া। ২৪ বছর আগে এই নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। আস্তে আস্তে সব মিলিয়ে যায়। 

১৬৪০ সালে ব্রিটিশ ভারতে একটি প্রশাসনিক উপবিভাগ বা প্রেসিডেন্সি করা হয়েছিল মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি নামে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্র প্রদেশের পুরোটা, উড়িষ্যা, কেরালা, কর্ণাটকের কিছু অংশ ছিল এই প্রেসিডেন্সির আওতায়।   প্রাচীন এই শহরটি আজ নানাভাবেই গুরুত্ব লাভ করেছে। চেন্নাই ভারতের মোটরগাড়ি শিল্পের রাজধানী। এখানে দেশের মোটরগাড়ি শিল্পের প্রায় চল্লিশ শতাংশ কোম্পানির ভিত্তি। দেশীয় গাড়ির একটি বড় অংশ এখানে তৈরি হয়। বছরে ১৪ লক্ষ গাড়ি উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে চেন্নাই। প্রতি মিনিটে ৩ টি গাড়ি তৈরিতে সক্ষম চেন্নাইর অটোমোবাইল সংস্থা। হুন্ডাই, নিসান, বিএমডব্লিউ, ইয়ামাহা, টিভিএসের মতো নামী গাড়ি নির্মাণ সংস্থার কারখানা রয়েছে চেন্নাইতে। 

চিকিৎসার জন্য দেশের সেরা হাসপাতালগুলি গড়ে উঠেছে এই শহরে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ ও তাদের স্বজনদের কাছে অতি পরিচিত নাম চেন্নাই। একটি গবেষনায় দেখা গেছে যে চল্লিশ শতাংশের বেশি মানুষ চেন্নাইকে বেছে নেয় চিকিৎসার জন্যে। ভারতের চিকিৎসা রাজধানী হিসেবে পরিচিত চেন্নাইয়ে প্রতিদিন দুই থেকে তিন শতাধিক আন্তর্জাতিক রোগী বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার জন্যে ভর্তি হন। 

বহুকাল ধরেই ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে চেন্নাই থেকে। দ্রাবিড় জাতিসত্তাকে মূলধন করে তামিল রাজনীতিতে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন করুণানিধি। বলতে গেলে দিল্লির ক্ষমতায় কে বসবে তাতে যেন করুণা-র ‘করুনা’ না থাকলে হওয়া কঠিন ছিল। কংগ্রেসের মৌরসিপাট্টার যুগে দিল্লির রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মোহরা ছিলেন তিনি। আর তাঁর হেড কোয়ার্টার ছিল চেন্নাই। 

দেশের স্বাধীনতার বছর দুই পর মাদ্রাজে আন্নাদুরেই তৈরি করেছিলেন দ্রাবিঢ় মুন্নেত্রা কাজাগম বা ডি এম কে দল। সেটাই ছিল ভারতের প্রথম আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল। ছয়ের দশকে আন্নাদুরেই তামিলনাডু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে ধীরে ধীরে অন্যান্য দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে আঞ্চলিকতাবাদ। জয়রাম জয়ললিতা কিম্বা এম জি রামাচন্দ্রন, এন টি রামা রাও যেমন রুপালী পর্দার কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন, তেমনি তারা পৌঁছেছিলেন আঞ্চলিক রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে। বেশ কয়েক দফায় তাঁরা হয়েছিলেন তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।