Tarapith Kali Temple: “জয় মা তারা, মা-কে একবার ছুঁয়ে প্রণাম করব।” তারাপীঠে গিয়ে এই আবদার প্রায় সব ভক্তের। এতদিন সেবাইতদের মাধ্যমে গর্ভগৃহে ঢুকে মা তারার শিলামূর্তি স্পর্শ করে পুজো দেওয়ার রীতি ছিল। কিন্তু এবার সেই ৫০০ বছরের প্রাচীন প্রথায় ছেদ পড়ল। মন্দির কমিটি ও প্রশাসনের যৌথ সিদ্ধান্তে জারি হল নতুন নিয়ম।
Tarapith Kali Temple: তারাপীঠ। তন্ত্রসাধনার অন্যতম পীঠস্থান। দ্বারকা নদের ধারে মা তারার রাজপাট। এতদিন এখানকার নিয়ম ছিল অন্যান্য শক্তিপীঠের থেকে আলাদা। ভক্তরা সেবাইত পান্ডাদের মাধ্যমে গর্ভগৃহে প্রবেশ করে মায়ের ব্রহ্মশিলা রূপকে ছুঁয়ে পুজো দিতে পারতেন, মায়ের পায়ে ফুল-বেলপাতা দিতে পারতেন। নিজের হাতে মায়ের মাথায় জবা ছোঁয়ানোর অনুভূতিই ছিল তারাপীঠের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু এবার সেই অধ্যায় শেষ।

কী কী বদলালো নতুন নিয়মে?
তারাপীঠ মন্দির কমিটির সম্পাদক তারাময় মুখোপাধ্যায় জানান, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে বৈঠকের পর ৫ দফা নতুন নিয়ম লাগু হয়েছে:
১. গর্ভগৃহে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ: এবার থেকে গর্ভগৃহের দরজার বাইরে থেকেই লাইন দিয়ে মা-কে দর্শন করতে হবে। রুপোর দরজার বাইরে নতুন করে রেলিং বসানো হয়েছে। শুধুমাত্র মন্দিরের নিযুক্ত সেবাইত ও পুরোহিতরাই পুজোর জন্য ভিতরে ঢুকবেন।
২. স্পর্শ দর্শন সম্পূর্ণ বন্ধ: মায়ের বিগ্রহ বা শিলামূর্তিকে ছোঁয়া, চরণামৃত নেওয়া, মায়ের পায়ে নিজের হাতে ফুল দেওয়া যাবে না। সব পুজো সামগ্রী পুরোহিতের হাতে দিতে হবে। তিনিই মায়ের কাছে নিবেদন করবেন।
৩. সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হল: ভিড় কমাতে প্রতিটি ভক্ত দর্শনের জন্য মাত্র ১০-১৫ সেকেন্ড সময় পাবেন। লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, ভিডিও করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে মোবাইল বাজেয়াপ্ত ও জরিমানা।
৪. বিশেষ দিনে আরও কড়াকড়ি: কৌশিকী অমাবস্যা, রটন্তী কালীপুজো, মঙ্গল ও শনিবার দিনে মন্দির চত্বরে প্রবেশের জন্য অনলাইন পাস সিস্টেম চালু হতে পারে। একদিনে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভক্তকেই ঢুকতে দেওয়া হবে।
৫. ডালা নিয়ে নিয়ম: বাইরে থেকে কেনা ডালায় ফল-মিষ্টি ছাড়া আর কিছু থাকলে গেটে আটকে দেওয়া হবে। সিঁদুর, আলতা, নকল গয়না বিগ্রহের ক্ষতি করে বলে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত? মন্দির কমিটি কী বলছে?
মন্দির কমিটির দাবি, তিনটি প্রধান কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা:
১. বিগ্রহের সুরক্ষা: দিনে ২০-৩০ হাজার ভক্তের ছোঁয়ায়, সিঁদুর-আলতায়, ঘামে মায়ের প্রাচীন ব্রহ্মশিলা মূর্তির ক্ষয় হচ্ছিল। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ২০২৫-এর রিপোর্টে বলা হয়, এভাবে চললে ১০ বছরে মূর্তির অবয়ব নষ্ট হয়ে যাবে।
২. ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা: শনি-মঙ্গলবার ও অমাবস্যায় ২-৩ লক্ষ মানুষের ভিড় হয়। গর্ভগৃহে ঢুকতে গিয়ে ঠেলাঠেলি, পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪-এর কৌশিকী অমাবস্যায় ৫ জন জখম হন। মহিলা ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছিল।
৩. স্বচ্ছতা আনা: বহু ভক্তের অভিযোগ, মোটা টাকা দিলে তবেই পান্ডারা গর্ভগৃহে ঢুকিয়ে স্পর্শ দর্শন করায়। গরিব ভক্তরা বঞ্চিত হন। নতুন নিয়মে VIP-সাধারণ সবার জন্য দর্শন একইরকম হবে। টাকার খেলা বন্ধ হবে।
এখন উপায় কী? কীভাবে দর্শন করবেন?
১. লাইনে দাঁড়িয়ে দূর থেকে দর্শন করুন। মনে মনে মন্ত্র জপ করুন: “ওঁ তারে তুত্তারে তুরে স্বাহা”।
২. মন্দিরের বাইরে নির্দিষ্ট কাউন্টারে পুজোর ডালা দিন। পুরোহিত আপনার নামে সংকল্প করে পুজো দেবেন।
৩. মন্দিরের ওয়েবসাইটে লাইভ দর্শনের ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। বাড়িতে বসেও মা-কে দেখতে পাবেন।
৪. তারাপীঠ মহাশ্মশানে গিয়ে বামাক্ষ্যাপার সমাধিতে মোমবাতি দিন। ওখানে ছোঁয়ার কোনো বাধা নেই।
শাস্ত্রজ্ঞরা বলছেন, “দর্শনাদেব পুনাতি” অর্থাৎ শুধু দর্শনেই পাপ নাশ হয়। মন যদি শুদ্ধ হয়, তবে দূর থেকে দেখলেও মা তারা ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


