চলতি মরশুম ক্রমশই দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে উঠছে লাল হলুদ সমর্থকদের কাছে। ২০২০-তে শতবর্ষ পূরণ করবে ক্লাব। তাই ক্লাবের ফুটবল টিমের কাছ থেকে অনেক আশা ছিল সমর্থকদের। কিন্তু সেই সমস্ত আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে খারাপ থেকে খারাপতর পারফরম্যান্স দেখিয়ে চলেছে ইস্টবেঙ্গল। 

আগের মরশুমের গোড়ার দিকে ক্লাবে কোয়েস নামক স্পনসরকে ঢাক ঢোল পিটিয়ে আনা হয়েছিল। ক্লাবের ৭০ শতাংশ শেয়ার কিনে রাতারাতি কোয়েস হয়ে উঠেছিল স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। সদ্য বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলার, কোস্টারিকান ডিফেন্ডার জনি আকোস্তা-কে এনে সমর্থকদের চমকে দিয়েছিল কোয়েস। এসেছিল হাই-প্রোফাইল কোচ, নামকরা স্ট্রাইকার। বিদেশে প্রি-সিজন কাটিয়েছিলেন লাল-হলুদ ফুটবলাররা। আই লিগও খারাপ কাটেনি তাদের। শেষ ম্যাচ অবধি খেতাব জয়ের লড়াইয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে আইলিগে দু বারই হারিয়েছিল তারা। লিগ না পাওয়ায় হতাশ হলেও দলের পারফরম্যান্সে খুশি ছিলেন বেশিরভাগ সমর্থকরাই।

 চলতি মরশুমের শুরু থেকেই ছবি বদলাতে শুরু করে। বার বার প্রকাশ্যে চলে আসে ক্লাব কর্মকর্তা এবং কোয়েস কর্তাদের মধ্যে চলতে থাকা অভ্যন্তরীণ বিরোধ। তার জেরে কোয়েসও ধীরে ধীরে খরচের ব্যাপারে হাত গুটিয়ে নিতে থাকে। গতবারের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করা জবি জাস্টিন কিংবা ডানমাওইয়াকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় ইস্টবেঙ্গল। সফল বিদেশী স্ট্রাইকার এনরিকে এসকুয়েদা এবং ডিফেন্ডার জনি আকোস্তা-কে রিলিজ দিতে বলেন কোচ আলেহান্দ্র মেনেনদেজ। তাদের বদলে স্পেন থেকে নিয়ে আসেন স্ট্রাইকার মার্কোস গিমিনেজ দে লা এসপাদা এবং আইএসএলে দিল্লি ডায়নামোজের হয়ে খেলে যাওয়া ডিফেন্ডার মার্তি ক্রেসপি কে। ডুরান্ড এবং কলকাতা লিগকে দল দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার জায়গা হিসাবে বাছেন কোচ। দুটি টুর্নামেন্টই অল্পের জন্য হাতছাড়া হয় ইস্টবেঙ্গলের। বেশিরভাগ সমর্থকই ধৈর্য হারাননি আই লিগে দল ভালো খেলবে আশা করে। এরপর আইলিগের আগে কোচ বিদেশে প্রি-সিজন করাতে চাইলে অজ্ঞাত কারণে তা করা সম্ভব হয় না। এতকিছুর পরও আই লিগে শুরুটা মন্দ হয়নি ইস্টবেঙ্গলের। ঘনঘন ম্যাচ খেলার পরও ৪ ম্যাচের ২টি জিতে, ২ টি ড্র করে লিগশীর্ষে থেকে বছর শেষ করে ইস্টবেঙ্গল।

ছন্দপতন ঘটে নতুন বছরে এসে। পরপর চার্চিল ব্রাদার্স আর গোকুলম কেরালার কাছে হেরে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের মুখোমুখি হয় ইস্টবেঙ্গল। সেই ম্যাচেও ২-১ ফলাফলে হারতে হয় তাদের। পরপর তিন ম্যাচে হারের দরুন পদত্যাগ করেন কোচ আলেহান্দ্র মেনেনদেজ। তার পর চেন্নাই সিটি এফ সি কে হারালেও শেষ শনিবার ইন্ডিয়ান অ্যারোজের কাছে ১-০ গোলে হারতে হয় ইস্টবেঙ্গলকে।

বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই নিম্নমানের বিদেশি রিক্রুট-কে এই অবস্থার জন্য দায়ী করছেন। ডিফেন্ডার বোরহা ফার্নান্দেজকে মরশুমের শুরু থেকেই পাননি লাল হলুদ। এরপর তার মেয়ের অসুস্থতার কারণে তাকে রিলিজ দিতে বাধ্য হয় ইস্টবেঙ্গল। জনি আকোস্তার বদলে আনা মার্তি ক্রেসপির অবস্থা খুবই করুণ। ডিফেন্স থেকে মাপা পাস বাড়ানো কিংবা সেটপিস থেকে বিপক্ষের রক্ষণে অসুবিধা তৈরি এই সমস্ত কাজ ঠিকঠাক করলেও তার প্রধান কাজ ডিফেন্ডিংটাই ঠিকঠাকমতো করে উঠতে পারছেন না তিনি। এই মরশুমে আই লিগে একটি ম্যাচেই গোল খায়নি ইস্টবেঙ্গল। ক্রেসপি ছিলেন না সেই ম্যাচে। স্ট্রাইকার মার্কোস গিমিনেজ গোল করলেও গোলের থেকে বেশি সহজ সুযোগ নষ্ট করেছেন বলে মনে করছেন অনেকে। অনেকের মতে সব সুযোগ ঠিকঠাক কাজে লাগালে এখন যা গোল করেছেন তার থেকে দ্বিগুন গোল করতে পারতেন মার্কোস। সাথে চূড়ান্ত অফফর্মে রয়েছেন স‍্যান্টোস কোলাডো। আগের মরশুমে যে ফর্মে ছিলেন তার ধারে-কাছে নেই তিনি। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে কাশিমও ধারাবাহিক নন। আশার আলো একমাত্র ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডার হুয়ান মেরা গঞ্জালেস। চলতি মরশুমে ভালো ফর্মে আছেন তিনি। 

এই অবস্থায় সবচেয়ে মুশকিলে পড়েছেন সমর্থকরা। দলের এই জঘন্য অবস্থা দেখে ভেঙে পড়েছেন অনেকেই। বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন তারা। এক-এক পক্ষ দোষ দেখছেন এক-এক জায়গার। কারওর নিশানায় কোচ, কেউ দায়ী করছেন স্পনসরকে, আবার কারওর অভিযোগের তীর ক্লাব কর্মকর্তাদের দিকে। তার মধ্যে যে সকল সমর্থক অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলের ভক্ত তাদের হয়েছে সবচেয়ে বড় মুশকিল। দলের হতশ্রী পারফরম্যান্স থেকে হতাশ হয়ে মাঠ থেকে বেরোন তারা, কাউকে দোষারোপ করতে পারেন না। বোবা চাহনিতে প্রশ্ন থাকে, এমন অবস্থা আর কতদিন। উত্তর আপাতত নেই কারও কাছে।