FIFA World Cup Brazil: ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা, যে দশ কারণে ব্রাজিলের ফুটবলে ঘন অন্ধকার
FIFA World Cup Brazil: একেবারে অন্ধকারে ব্রাজিলের ফুটবল। ৩৬ বছর পর এত দ্রুত বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ব্রাজিল। ২৪ বছর পরেও কাটল না অপেক্ষা। ব্রাজিলকে এত দীর্ঘ বছর ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা কখনও করতে হয়নি। কিন্তু কী কারণে এত খারাপ হাল পেলের দেশের?

১) ব্রাজিলিয়ানদের কাছে শুধু ফুটবলটাই আর জীবন নয়
FIFA World Cup Brazil: ব্রাজিল মানে ফুটবল, আর ফুটবল মানে ব্রাজিল। এটা যেন একেবারে সমার্থক শব্দ হয়ে উঠেছিল। ব্রাজিল হল ফুটবলের দেশ। এটাও সবার জানা। কিন্তু গত কয়েক বছর ব্রাজিলের তরুণ প্রজন্ম, জেন জি-র কাছে ফুটবল আর শুধু একটা অপশন নয়, জীবনও নয়। কোপা কাবানার সমুদ্র সৈকতে এখন ফুটবলই একমাত্র খেলা নয়। বাস্কটবল, টেনিস, ভলিবল, সাঁতার...
ব্রাজিলিয়ানদের তরুণ প্রজন্মের কাছে এখন ফুটবলের পাশাপাশি এখন অপশন অনেক। তার প্রভাবটা জাতীয় দলে পড়ছে। একসময় ব্রাজিলে ফুটবল ছিল আবেগ, সংস্কৃতি আর জীবনের অংশ। এখন তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য খেলাধুলা, বিনোদন ও ডিজিটাল দুনিয়ায়। ফলে ফুটবলের প্রতি সেই সর্বগ্রাসী আবেগ ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা আগের মতো আর দেখা যায় না।

২) 'আমরাই সেরা' মানসিকতার হারিয়ে যাওয়া
পেলে, জিকো, রোমারিও, কাফু, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহোদের সময় ব্রাজিল মাঠে নামত অপ্রতিরোধ্য আত্মবিশ্বাস নিয়ে। এখন সেই জয়ের মানসিকতা ও প্রতিপক্ষকে ভয় না পাওয়ার মনোভাব অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আমরা হারতে পারি না, কারণ আমরা ব্রাজিল। এমন টগবগে মনোভাবটা এখনকার ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের মধ্যে দেখা যায় না। বড় ম্যাচে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি স্পষ্ট।
৩) ফুটবল কর্তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার অভাব
আধুনিকতা নাকি ঐতিহ্য। ব্রাজিলের ফুটবল কোন পথ ধরবে, সেটা নিয়ে দ্বিধা কাটছেই না ব্রাজিলের ফুটবল কর্তাদের। এই প্রথম কার্লো আনসেলোত্তিরর মত হাইপ্রোফাইল বিদেশী কোচ নিয়ে বিশ্বকাপে খেলে ব্রাজিল। কিন্তু শুধু বিদেশী কোচ নিয়ে এলেই তো আর আধুনিকতার পথ ধরা হয় না। বারবার কোচ বদল, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা ব্রাজিলের ফুটবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কর্তাদের ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি পড়ছে জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে।
৪) ঘরোয়া ফুটবল পরিকাঠামো ইউরোপিয়ানদের কাছে ফিকে
পরিকাঠামো থেকে প্রতিভায় যেখানে ইউরোপের দেশগুলি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে, সেখানে ব্রাজিলের ফুটবল হাঁটছে পিছনের দিক।
২০২২ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার থেকে গত ৬টি বিশ্বকাপে খালি হাত ব্রাজিলের। গত ৬টি বিশ্বকাপে ৬টি আলাদা আলাদা ইউরোপিয়ান দেশের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসের মত প্রথম সারির ইউরোপিয়ান দেশগুলির পাশাপাশি, বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, নরওয়ের মত দেশগুলির কাছেও নক আউট পর্বে হারে পেলের দেশ।
গত ৬টি বিশ্বকাপে যাদের কাছে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল
২০০৬ বিশ্বকাপ:কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় (ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ০-১ গোলে হার)
২০১০ বিশ্বকাপ: কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় (নেদারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১-২ গোলে হার)
২০১৪ বিশ্বকাপ: সেমিফাইনাল থেকে বিদায় (জার্মানির বিরুদ্ধে ১-৭ গোলে হার)
২০১৮ বিশ্বকাপ:কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় (বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ১-২ গোলে হার)
২০২২ বিশ্বকাপ: কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় (ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে হার)
২০২৬ বিশ্বকাপ: প্রি কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় (নরওয়ের বিরুদ্ধে ১-২ গোলে হার)
৫)ক্লাবের প্রতি প্রেম, দেশের জার্সিতে উজাড় করে দেওয়ার অভাব
বিশ্বের সর্বত্র ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের চাহিদা আকাশছোঁয়া। ইংল্যান্ড থেকে স্পেন, জার্মানি থেকে ফ্রান্স, ইউরোপিয়ান শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলিতে কয়েকশো কোটি টাকায় ব্রাজিলয়ান ফুটবলারদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। আকাশছোঁয়া অর্থের কারণে দেশের জার্সির প্রতিটান কমছে আধুনিক সাম্বা ফুটবলারদের। পেলে, রোমারিও, রোনাল্ডোদের যে সমস্যাটা কখনও হয়নি।
৬) বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে বারবার ব্যর্থতা
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ওপর প্রত্যাশার চাপ সবসময়ই বেশি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নকআউট ম্যাচে সেই চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে দল। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আত্মবিশ্বাস হারানোর ছবিই বেশি দেখা গেছে।
৭) দীর্ঘ ট্রফি-খরা, বাড়ছে হতাশা
২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি ব্রাজিল। কোপা আমেরিকাতেও ধারাবাহিক সাফল্য নেই। দীর্ঘ ট্রফি-খরা দলের আত্মবিশ্বাস ও মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
৮) বদলে গিয়েছে যুব ফুটবলার তৈরির ধরণ
আগে রাস্তায়-ঘাটে খেলে তৈরি হতো ব্রাজিলের জাদুকর ফুটবলাররা। এখন অল্প বয়সেই একাডেমি ও ইউরোপমুখী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে স্বাভাবিক সৃজনশীলতা কিছুটা কমে যাচ্ছে।
৯) দলগত সংহতির অভাব
দলে তারকার অভাব নেই, কিন্তু একসঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা ও বোঝাপড়ায় ঘাটতি রয়েছে। ব্যক্তিগত দক্ষতা থাকলেও দল হিসেবে ব্রাজিলকে অনেক সময় ছন্নছাড়া দেখায়।
১০) হারিয়ে যাচ্ছে 'জোগো বনিতো'র ব্রাজিলিয়ান ঘরানা
একসময় ব্রাজিল মানেই ছিল সুন্দর, আক্রমণাত্মক ও সৃজনশীল ফুটবল। আধুনিক ফুটবলের চাপে সেই ঐতিহ্যবাহী 'জোগো বনিতো' ধারা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আর সেটাই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পরিচয় সংকট।

