পেট্রোল ও ডিজেলের বিকল্প জ্বালানির খোঁজে বড় সাফল্য পেলেন বিজ্ঞানীরা। বাঁশ থেকে তেলের মতো এক ধরনের কাঁচামাল তৈরি করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের ওরচেস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গবেষকরা। পরীক্ষাগারে মাত্র ১০ মিনিটে এই পদার্থ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

পেট্রোল ও ডিজেলের বিকল্প জ্বালানির খোঁজে বড় সাফল্য পেলেন বিজ্ঞানীরা। বাঁশ থেকে তেলের মতো এক ধরনের কাঁচামাল তৈরি করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের ওরচেস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গবেষকরা। পরীক্ষাগারে মাত্র ১০ মিনিটে এই পদার্থ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের দাবি, ভবিষ্যতে এই কাঁচামাল পরিশোধন করে গাড়ি, বিমান ও ট্রেনের জ্বালানি তৈরি করা যেতে পারে। তবে এখনও এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

কীভাবে বাঁশ থেকে তৈরি হচ্ছে তেল?

বাঁশকে জ্বালানির কাঁচামালে পরিণত করতে গবেষকরা ব্যবহার করেছেন হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন (Hydrothermal Liquefaction বা HTL) প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে জল, উচ্চ তাপমাত্রা এবং উচ্চচাপের সাহায্যে উদ্ভিদজাত উপাদানকে তেলের মতো পদার্থে রূপান্তরিত করা হয়। পরীক্ষার সময় বাঁশকে ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মাত্র ১০ মিনিট গরম করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় বাঁশের মোট ওজনের প্রায় ৩৫.৬ শতাংশ তেলের মতো কাঁচামালে পরিণত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই পরীক্ষায় আলাদা করে কোনও রাসায়নিক অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট ব্যবহার করা হয়নি। তবে এই পদার্থ সরাসরি গাড়ির ট্যাঙ্কে ভরে চালানো যাবে না। উপযুক্ত জ্বালানি তৈরি করতে এটিকে আরও পরিশোধন এবং প্রক্রিয়াকরণের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।

জ্বালানি তৈরিতে বাঁশ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাঁশ খুব দ্রুত বাড়ে। তুলনামূলকভাবে কম উর্বর জমিতেও এর চাষ করা সম্ভব। ফলে জৈব জ্বালানি তৈরির জন্য বাঁশকে সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। বর্তমানে ভুট্টার মতো ফসল থেকেও জৈব জ্বালানি তৈরি করা হয়। কিন্তু এই ধরনের ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষিজমির প্রয়োজন হয়। বাঁশের ক্ষেত্রে সেই চাপ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, আমেরিকায় ভুট্টা থেকে যে পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা হয়, সমপরিমাণ জ্বালানি উৎপাদনের জন্য বাঁশ চাষে তার প্রায় ১৩ শতাংশ জমিই যথেষ্ট হতে পারে। তবে এটি গবেষণাভিত্তিক অনুমান, বাস্তব বাণিজ্যিক উৎপাদনের চূড়ান্ত ফল নয়।

বাঁশ থেকে তৈরি জ্বালানির দাম কত হতে পারে?

গবেষকদের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু হলে বাঁশ থেকে তৈরি জ্বালানির খরচ প্রতি গ্যালন পেট্রোলের সমতুল্য জ্বালানির জন্য প্রায় ২.৭৫ ডলার হতে পারে। ভারতীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ আনুমানিক ২৬০ টাকা। তবে এই হিসাবকে পেট্রোল পাম্পে বিক্রি হওয়া পেট্রোল বা ডিজেলের দামের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ, বাস্তবে জ্বালানি উৎপাদনের কারখানা তৈরি, যন্ত্রপাতি চালানো, বাঁশ পরিবহণ এবং অন্যান্য খরচের বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে প্রকৃত খরচ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

ডিজেলের তুলনায় কতটা কমবে দূষণ?

এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পরিবেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বাঁশ থেকে তৈরি জ্বালানি ব্যবহার করলে প্রচলিত পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক ডিজেলের তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ২৬ গুণ পর্যন্ত কম হতে পারে। বাঁশ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি মাটির নীচে থাকা শিকড়ের মাধ্যমেও কার্বন সঞ্চয় করতে পারে। এই বিষয়টিও জ্বালানির সামগ্রিক কার্বন নির্গমন কমানোর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে বাঁশ চাষ, জ্বালানি তৈরির প্রক্রিয়া, পরিবহণ এবং জ্বালানি পোড়ানোর সময় উৎপন্ন নির্গমন—সবকিছু হিসাব করেই পরিবেশগত সুবিধা নির্ধারণ করতে হবে। তাই এই ফলাফলকে আপাতত গবেষণাভিত্তিক অনুমান হিসেবেই দেখা উচিত।

ভবিষ্যতে কি পেট্রোল-ডিজেলের বদলে বাঁশের জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে?

গবেষণার ফলাফল ইতিবাচক হলেও বাঁশ থেকে তৈরি এই তেল এখনও পেট্রোল ও ডিজেলের সম্পূর্ণ বিকল্প হয়ে ওঠেনি। জ্বালানির গুণমান, উৎপাদন খরচ, বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা এবং যানবাহনের ইঞ্জিনে এর কার্যকারিতা নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। সব দিক থেকে সাফল্য মিললে ভবিষ্যতে গাড়ি, বিমান ও ট্রেনের মতো পরিবহণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই জ্বালানি ব্যবহার করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যে সব ক্ষেত্রে বিদ্যুৎচালিত প্রযুক্তির ব্যবহার কঠিন, সেখানে কম কার্বন নির্গমনকারী তরল জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সব মিলিয়ে, বাঁশ থেকে জ্বালানি তৈরির এই গবেষণা ভবিষ্যতের বিকল্প শক্তির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এখনই পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমবে বা গাড়িতে বাঁশের জ্বালানি ব্যবহার শুরু হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় আসেনি।