কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সেমিকন্ডাক্টরের ক্ষেত্রে ভারতের বিশাল সুযোগ রয়েছে। চিপ ডিজাইন, গবেষণা, উৎপাদন ক্ষমতা এবং এআই ইনফারেন্সের উপর মনোযোগ দিলে দেশটি একটি প্রযুক্তিগত পরাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
টেকনোলজি এখন সবকিছুর মূল ভিত্তি। আগামী তিন বছরের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) নিয়ে ভারত কী পদক্ষেপ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই শতকে আমরা বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা দাপট দেখাতে পারব।
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর প্রতিযোগিতায় তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চিন
সেমিকন্ডাক্টর দুনিয়ায় তাইওয়ান এখন একচেটিয়া রাজত্ব করছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে ওদের বাদ দিয়ে কিছু ভাবাই যায় না। অন্যদিকে এআই চিপ বিপ্লবের হাত ধরে স্যামসাং আর এসকে হাইনিক্স দারুণ ব্যবসা করছে। এর জেরে ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার বাজার সূচক 'কসপি' এক ধাক্কায় ৭২ শতাংশ লাফ দিয়েছে। চিনও বসে নেই। নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে ২০১৫ সাল থেকে তারা প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এই সেক্টরে। পিছিয়ে নেই আমেরিকাও। 'চিপস অ্যাক্ট' পাশ করিয়ে তারা ৫৩ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি ভর্তুকি দিয়েছে, যার ফলে সেখানে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ ঢুকেছে।
ভারতের দুই প্রধান শক্তি
টেক দুনিয়ায় বড় লাফ দেওয়ার জন্য তিনটে জিনিসের দরকার হয়। এর মধ্যে দুটোই ভারতের আছে— বিপুল জনসংখ্যা আর মেধা। গ্লোবাল এআই আর সেমিকন্ডাক্টর তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের ইঞ্জিনিয়ার আর বিজ্ঞানীরা একেবারে সামনের সারিতে রয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন, প্রযুক্তির ওপর নিজস্ব অধিকার কায়েম করতে ভারত সেভাবে বিনিয়োগ করেনি। এই খামতিটাই এখন বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সম্প্রতি আমেরিকা বেশ কিছু এআই মডেলে অন্যদের নাক গলানো বন্ধ করেছে। এর থেকে পরিষ্কার, প্রযুক্তি আটকে রাখাটা এখন জিওপলিটিক্সের একটা বড় হাতিয়ার। নিজেদের ক্ষমতা না বাড়ালে ভারতকে আগামী দিনে চরম প্রযুক্তিগত বৈষম্যের মুখে পড়তে হবে।
ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন (ISM), ডিজাইন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (DLI) আর ইন্ডিয়াএআই (IndiaAI) মিশন— এগুলো নিঃসন্দেহে সঠিক দিশায় প্রথম পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে যে টিম এগুলো তৈরি করেছিল, আমিও তার একটা অংশ ছিলাম। কিন্তু এই শুরুটাই শেষ কথা নয়। আসল প্রশ্ন হল, ভারত কি এটাকে একটা বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবে বদলে ফেলতে পারবে? 'সেমিকন ইন্ডিয়া ২০২৬' সামিটে ১২টি ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের ছাড়পত্র মিলেছে, ১.৬৪ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এরপরই ১.২৭৫ লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক সাহায্য নিয়ে হাজির হয়েছে আইএসএম ২.০। কিন্তু এর পেছনে একটা বড় কাঠামোগত গলদ লুকিয়ে আছে। যে ১২টা ইউনিট ছাড়পত্র পেয়েছে, তার মধ্যে ৯টাই হল পুরনো ধাঁচের এটিএমপি/ওএসএটি (ATMP/OSAT) ফেসিলিটি। অর্থাৎ, এরা শুধু ওয়্যার-বন্ড অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং, মার্কিং আর প্যাকেজিংয়ের কাজ করবে। এগুলো এমন প্রযুক্তি যার ভ্যালু অ্যাডিশন সবচেয়ে কম, খুব সহজেই এর বিকল্প পাওয়া যায় আর এগুলো বেশ পুরনোও বটে।
এই কাঠামোগত সমস্যাটা বোঝা খুব জরুরি। 'চায়না প্লাস ওয়ান' (China+1) স্ট্র্যাটেজির ওপর ভর করেই ইলেকট্রনিক্স পিএলআই (PLI) স্কিম সফল হয়েছিল। অ্যাপল আর স্যামসাং যখন তাদের কারখানাগুলো চিনের বাইরে সরাতে চাইল, ভারত সেই সুযোগটা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে। এখন সারা বিশ্বের ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ আইফোন ভারতেই অ্যাসেম্বল হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শিল্পনীতির এটা অন্যতম বড় সাফল্য।
কিন্তু সেমিকন্ডাক্টরের দুনিয়ায় যা ঘটছে, সেটা শুধু সাপ্লাই চেইন বদলানো নয়, এটা একটা আস্ত কাঠামোগত বিপ্লব। এনভিডিয়ার (Nvidia) ডেটা সেন্টার থেকে আয় ২০২০ সালে ছিল ৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ বিলিয়ন ডলারে। এআই যুগ কম্পিউটিংয়ের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে। এই অবস্থায় পুরনো ওয়্যার-বন্ড প্যাকেজিংয়ে যেখানে মাত্র ৬ শতাংশ গ্রস মার্জিন থাকে, সেখানে নিজস্ব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) দিয়ে চিপ ডিজাইনিং করলে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখা যায়। পুরনো ওয়্যার-বন্ড প্যাকেজিংয়ের লাভ হু হু করে কমছে। অন্যদিকে জিপিইউ আর মেমোরি মিলিয়ে যে অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং (CoWoS) হয়, তাতে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত লাভ থাকে। আইএসএম ২.০-এর লক্ষ্য হওয়া উচিত ঠিক এই জায়গাটাতে পৌঁছানো।
বিনিয়োগের কৌশল
বিনিয়োগের কৌশলটা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ফোকাস করতে হবে ডিজাইন আইপি আর রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ওপর। ভারতে এই মুহূর্তে গবেষণার পরিকাঠামো যুক্ত কোনও নির্দিষ্ট সেমিকন্ডাক্টর রিসার্চ ইনস্টিটিউট নেই। সরকার আর শিল্পের যৌথ বিনিয়োগে বিশেষজ্ঞদের তৈরি করার জন্য একটা ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর রিসার্চ ইনস্টিটিউট গড়ার কথা আইএসএম ১.০-তে বলা হয়েছিল। এই কাজটা আর ফেলে রাখা ঠিক হবে না।
সেমিকন্ডাক্টার মার্কেটের ২টি ভাগ
এআই বিপ্লব সেমিকন্ডাক্টর মার্কেটকে দু'ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। এআই ট্রেনিংয়ের (মডেল তৈরি) বাজারটা এখন এনভিডিয়ার কুডা (CUDA) সিস্টেম আর হাইপারস্কেলারদের কাস্টম এএসআইসি (ASIC)-র দখলে। এই বাজারটা অন্যদের জন্য আপাতত বন্ধ। কিন্তু 'ইনফারেন্স' মার্কেট সবার জন্য খোলা। ক্লাউড, এজ, প্রতিরক্ষা, কৃষি বা শিল্পের কাজে এর চাহিদা এতই বৈচিত্র্যময় যে, কোনও একটা নির্দিষ্ট কাঠামো দিয়ে এখানে একচেটিয়া রাজত্ব করা সম্ভব নয়। বিশেষ কাজের জন্য তৈরি ইনফারেন্স চিপগুলো ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত লাভের সুযোগ দেয়। আর এগুলো তৈরি করার মতো ১ লক্ষ ২৫ হাজার চিপ ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার ভারতেই আছেন। এখন দরকার ডিএলআই স্কিমের বিস্তার, আইএসএম ২.০-এর মাধ্যমে এনআইআইএফ (NIIF) মডেলে ১০০০ কোটি টাকার চিপ ডিজাইন কমার্শিয়ালাইজেশন ফান্ড তৈরি করা, আর অন্তত দুটো এআই ইনফারেন্স চিপ প্রোগ্রাম শুরু করা যেখানে সরকার সরাসরি কেনার গ্যারান্টি দেবে। বাজেটে যদি এই দুটো বদল আনা যায়, তবে আরও কয়েকটা ওয়্যার-বন্ড প্যাকেজিং প্রজেক্ট চালুর চেয়ে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর সেক্টরে অনেক বড় বিপ্লব আসবে।
ভারতের লক্ষ্য
ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন, ডিএলআই আর ইন্ডিয়াএআই শুরু করার টিমে থাকতে পেরে আমি গর্বিত। কারণ আমি বিশ্বাস করি, এআই যুগে ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এই ক্ষমতা বাড়ানোর ওপরই নির্ভর করছে। এটা বাস্তবায়িত করার জন্য ভারতের কাছে দক্ষ মানবসম্পদ, দেশের ভেতরের বিপুল চাহিদা আর একজন দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন। ভারতের এখন দরকার ডিজাইন আর টেকনোলজির ওপর ভিত্তি করে একটা সরাসরি জাতীয় কৌশল। গত কয়েক দশকে বড় বড় অর্থনৈতিক বা শিল্প বিপ্লবের সুযোগ ভারত হয় হাতছাড়া করেছে, নয়তো আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি। কিন্তু এই টেকনোলজির দৌড়ে আমরা কোনওভাবেই পিছিয়ে পড়তে চাই না। যে দেশগুলো গোটা বিশ্বের জন্য চিপ ডিজাইন করবে, তারাই এই শতকের ইতিহাস লিখবে। আর সেই তালিকায় নিজেদের নাম তোলার সবরকম যোগ্যতা ভারতের আছে।
(লেখক একজন প্রাক্তন সংসদ সদস্য এবং ভারত সরকারের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী। তিনি কেরলম-এর বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও বিধায়ক।)

