শমিকা মাইতিঃ কখনও নরম, কখনও গরম। কখনও আঙুল উঁচিয়ে জোর গলায়, কখনও খাদে গলা নামিয়ে হাত জোড় করে প্রণাম ভঙ্গি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাঙা বাংলা মেশানো হিন্দি ভাষণ শুনতে ভিড় উপচে পড়ছে জনসভায়। ২০২১-এ পশ্চিমবঙ্গ ভোট বৈতরণী পেরোতে সেই মোদীই ভরসা বিজেপি-র। রাজ্যে পরিবর্তন আসছে ও বিজেপি সরকার গঠিত হতে চলেছে তা নিশ্চিৎ করে প্রতিটি সভায় বলছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার 'দিদি' সম্বোধন করে আক্রমণ ঝড় তুলছে বিজেপি কর্মী সমর্থকদের অন্দরে।
 
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও অসম, তামিলনাড়ু, কেরল ও পুদুচেরিতে ভোটের দামামা বেজেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিজেপি। এর কারণ হিসাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ শুধু উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার নয়, এই রাজ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক সীমারেখা রয়েছে। অনুপ্রবেশের মতো বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে জড়িয়ে রয়েছে এই রাজ্য। তাই বাংলার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে তাঁদের কাছে। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে ১৮টি আসন পাওয়ার পর থেকেই এই রাজ্যে ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখছে বিজেপি। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের প্রচারে তাই কোনও কমতি রাখতে রাজি নয় তারা। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ থেকে শুরু করে বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতা ও তারকাদের নিয়ে ভোটপ্রচারের রূপরেখা তৈরি হয়েছে। তবে লোক টানার জন্য বিজেপি-র সবচেয়ে বড় ভরসা প্রধানমন্ত্রী। রাজ্য বিজেপি-র যা পরিকল্পনা, তাতে ২০টির মতো সমাবেশ করবেন মোদী।

এবারের ভোট-প্রচারে মোদীর স্লোগান ‘আসল পরিবর্তন’।  উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে বামেদের থেকে ক্ষমতা দখলের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্লোগান তুলেছিলেন পরিবর্তনের। মোদীর ‘আসল পরিবর্তন’ তারই পাল্টা জবাব। মোদীর কথায় ‘বাংলার আসল পরিবর্তন আনাই হবে বিজেপি-র কাজের আধার। এমন বাংলা হবে যেখানে যুবকদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এমন বাংলা যেখানে মানুষকে রাজ্য ছেড়ে যেতে হবে না। আসল পরিবর্তন মানে এমন বাংলা, যেখানে শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি হবে। বিনিয়োগ আসবে। এমন বাংলা যেখানে একুশ শতকের আধুনিক পরিকাঠামো হবে। যেখানে গরিবদের অগ্রসর হওয়ার সুযোগ থাকবে।’

বিরোধীদের তোলা অভিযোগের জবাব দিতে ছাড়েন না মোদী। যেমন, ভিন্‌রাজ্যের বিজেপি নেতাদের ‘বহিরাগত’ বলে নিয়মিত আক্রমণ করেন তৃণমূল নেতারা। ৭ মার্চ কলকাতায় রেসকোর্সের মাঠে ব্রিগেড সমাবেশে মোদী সেই খোঁচার জবাব দিতে গিয়ে বলেন, ‘বিজেপি-কে বহিরাগত বলছেন? আপনারা বলুন কংগ্রেস কে তৈরি করেছিল? বামপন্থীরা এত বছর শাসন করেছে এখানে। মার্ক্স-লেনিনের আদর্শ বহিরাগত না বাংলার? তৃণমূলও তো কংগ্রেস থেকে তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিজেপি-র স্থাপনার মূলে আছে বাংলা। বিজেপি পুরোপুরি বাংলার দল। বিজেপি-র প্রতিষ্ঠার প্রেরণাই ছিলেন এক জন বাঙালি। বিজেপি এমন একটি রাজনৈতিক দল যার ডিএনএ-তে বাংলা রয়েছে। বাংলার সুপুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শে তৈরি হয়েছে এই দল। বাংলার গন্ধ লেগে রয়েছে বিজেপি-তে।’

এক-একটা সভায় এক-এক ভাবে আক্রমণের স্ট্র্যাটেজি। ১৮ মার্চ পুরুলিয়ায় ভোটের প্রচারে এসে যেমন মোদী পিছিয়ে থাকা জঙ্গলমহলে অনুন্নয়ন ও বঞ্চনার প্রসঙ্গ বারবার তুলে আনেন। তৃণমূলকে নিশানা করে মোদী বলেন, ‘দলিত আদিবাসী, বনবাসীদের কখনও নিজের ভাবেননি মমতা। করোনার সময় কেন্দ্রের দেওয়া সস্তার চালও লুঠ করেছে দিদির লোকেরা।’ প্রধানমন্ত্রীর মতে, বাম আমলের মতোই তৃণমূলের সরকারও পুরুলিয়ায় শিল্পায়নের বিষয়টি অবহেলা করেছে। বিজেপি ক্ষমতায় এসে জঙ্গলমহলের উন্নয়নে কাজ করবে বলে আশ্বাস দেন মোদী। 

২০ মার্চ খড়্গপুরের বিএনআর মাঠে মোদীর সভাতেও ভিড় হয়েছিল ভালই। সেখানে মোদী বলেন, ‘দিদির দল নির্মমতার পাঠশালা। সেই পাঠশালার সিলেবাস হচ্ছে তোলাবাজি। দিদির পাঠশালায় সিলেবাস কাটমানি। দিদির পাঠশালায় সিলেবাস সিন্ডিকেট’। পিসি ভাইপো-র আক্রমণকে এক ধাপ চড়িয়ে মোদী বলেন, ‘দেশের অন্য রাজ্য উন্নয়নের জন্য সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থা চালু আছে। আর বাংলায় সিঙ্গল উইন্ডো হল ভাইপো উইন্ডো। পশ্চিমবঙ্গে এই উইন্ডো দিয়ে না ঢুকলে কিছু হবে না।’

আগামী ২২ মার্চ বাঁকুড়া ও ২৪ মার্চ কাঁথিতে মোদীর সভা রয়েছে। প্রসঙ্গত, মোদীর মোটামুটি ভাবে প্রতি জেলায় একটা করে সভা করার কথা। কিন্তু পূর্ব মেদিনীপুর ব্যাতিক্রম। এই জেলার হলদিয়ায় ৭ ফেব্রুয়ারি একবার সভা করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আবার ২৪ মার্চ তিনি আসছেন কাঁথিতে। কারণ, এই জেলাতেই বিধানসভা নির্বাচনের হাইভোল্টেজ আসন নন্দীগ্রাম। যেখানে মুখোমুখি হবেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সদ্য বিজেপি-তে আসা শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি সূত্রে খবর, দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে মোদীর সভা হতে পারে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায়। ওই দফায় জেলার ৪টি আসন গোসাবা, পাথরপ্রতিমা, কাকদ্বীপ ও সাগরে ভোটগ্রহণ রয়েছে।