শমিকা মাইতিঃ ভোট এলেই এই বাংলার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে তুফান ওঠে। কোন দল জিতছে, কে এগিয়ে, এই সব আলোচনার মধ্যেই একটা দীর্ঘশ্বাস সব সময় শোনা যায়- আমাদের পুরনো গৌরব কি আর ফিরবে না। একসময় ব্রিটিশ আমলের রাজধানী ছিল তিলোত্তমা কলকাতা। শিল্প থেকে অর্থনীতি সবেতেই তখন শিখরে বাংলা। আজ বাংলা যেরকম পিছিয়ে পড়েছে, তেমনই অস্তমিত কলকাতার গৌরব। অথচ, পাশের বাংলাদেশ তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে। অনেকে হয়তো বলবে বাংলাদেশ একটা দেশ, পশ্চিমবঙ্গ সেখানে রাজ্য। দু’টোর তুলনা হয় না। কথাটা ঠিক হলেও ভৌগোলিক দিক দিয়ে দুই বাংলার কিন্তু বিশেষ ফারাক নেই। নদীমাতৃক সমতল ভূমি, একই খাদ্যাভ্যাস, এক ভাষা। এ হেন বাংলাদেশে যেখানে পার-ক্যাপিটা ইনকাম ২,০০০ সেখানে পশ্চিমবঙ্গে ১,৫০০। প্রথমার জিডিপি গ্রোথ গড়ে যেখানে ৭ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে সেখানে শেষ দশ বছরে ৫ শতাংশের আশপাশ। বস্তুত ভারতবর্ষের সঙ্গে তুলনা করলেও, বাংলাদেশ পার ক্যাপিটা ইনকামে ছাপিয়ে গিয়েছে। যে ভাবে এগোচ্ছে বাংলাদেশে তাতে আগামী দিনে অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমাদের টেক্কা দিল বলে।

দুঃখের কথা হল, বাংলাদেশ ঠিক যতটা এগোচ্ছে এপার বাংলা ঠিক ততটাই পিছিয়ে পড়েছে। ভারতের ৩৩টি রাজ্যের মধ্যে আগে যেখানে প্রথম সারিতে ছিল বাংলা এখন সেখানে ২১ নম্বরে তার স্থান। অথচ, কলকাতা কিন্তু এখনও অন্যতম ধনী শহর। মুম্বই আর দিল্লির পরেই রয়েছে কলকাতা। পরিকাঠামোর দিক দিয়েও পুনে বা এই ধরনের শহরের থেকে অনেক এগিয়ে কলকাতা। ব্যাঙ্গালোরের থেকে কলকাতার ট্রাফিক অনেক ভাল, দিল্লির থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভাল, মুম্বইয়ের থেকে যাতায়াত ব্যবস্থা কলকাতায় অনেক ভাল। পূর্ব ভারতে কলকাতাই একমাত্র শহর যেখানে  শিল্প উপযোগী সমস্তরকম পরিকাঠামো রয়েছে। শিক্ষা হোক বা চিকিৎসা ব্যবস্থা, কলকাতাই সবচেয়ে বড় ভরসা পূর্ব ভারতের লোকজনের কাছে। সর্বোপরি শিল্পসংস্কৃতিতে কলকাতা এখনও অনেক এগিয়ে।  এত কিছুর পরেও কলকাতা বা বাংলার পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ, শিল্পে বিনিয়োগ আনতে না-পারা। 

গত দশ বছরে শিল্প সম্মেলনের মঞ্চে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লগ্নির প্রস্তাব এলেও সেই অনুপাতে শিল্পায়ন হয়নি এই রাজ্যে। কারণ শুধুমাত্র লগ্নি আনলেই হয় না, সরকারকে শিল্পস্থাপনের জন্য অনুকূল পরিবেশও তৈরি করে দিতে হয়। এর মধ্যে রাস্তাঘাট, বিদ্যুতের মতো পরিকাঠামোর কাজ যেমন পড়ে, তেমনই  আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিও থাকে। এই রাজ্যে লগ্নিকারীদের অভিযোগ, সাহায্য তো দূর শাসকদলের লোকেরা দাদাগিরি করে কাজ বন্ধ করে দেয়। তোলাবাজি আর সিন্ডিকেটের দাপটে কোনও কাজ করা কঠিন এই রাজ্যে। বিভিন্ন শিল্পের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সামলাতেও তৃণমূল সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে মনে করে শিল্পমহল। এই  রাজ্যের শ্রমমূল্য খুবই কম। ভিন্‌ রাজ্যে একই কাজের জন্য যে বেতন পাওয়া যায়, এ রাজ্যে তার অর্ধেক মেলে।

অর্থাৎ শুধু শিল্পে বিনিয়োগ আনলেই হবে না, তার সঙ্গে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট-রাজ যাতে শিল্পের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, শিল্পের অনুকূল পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, শ্রমের যথাযথ মূল্য যাতে মেলে সেদিকে নজর দিতে হবে। তবেই কমবে ‘ব্রেন-ড্রেন’। আর জোর দিতে হবে কলকাতার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে। কারণ এই শহরকে কেন্দ্র করেই বাংলার সমস্ত কাজকর্ম হয়। শিল্পায়নের জন্য যেমন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার দরকার, তেমনই কলকাতার উন্নয়নেও নির্দিষ্ট রূপরেখা দরকার। তিলোত্তমা কলকাতাই এনে দেবে বাংলার ‘আসল পরিবর্তন’।