তাপস দাস: ২০১২ সালের মার্চ মাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার একটি নির্দেশিকা জারি করে, যাতে বলা হয়েছিল সমস্ত রাজ্য সরকারের অনুদান পোষিত গ্রন্থাগারগুলিতে আটটি ছাড়া সমস্ত সংবাদপত্র রাখা নিষিদ্ধ। যে আটটি সংবাদপত্র কেনা ও প্রদর্শনে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল, তার বেশ কয়েকটি সারদা সংস্থার।

সারদা তখন রমরমিয়ে। আর এক বছর  পরেই মুখ থুবড়ে পড়বে এই পঞ্জি প্রকল্প। কিন্তু তখনও তার সূত্রপাত ঘটেনি। তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি কেনেন সুদীপ্ত, সদ্য ক্ষমতাসীন হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের আশীর্বাদধন্য এই চিট ফান্ড।

সারদা তার কাজকর্ম শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকার সময়েই সুদীপ্ত সেন গুছিয়ে তুলছিলেন তাঁর বেআইনি কাজের ভিত। ২০০৯ সাল থেকে সেবি ( Securities and Exchange Board of India) সারদার উপর নজরদারি শুরু করে। ২০১১ সালে তারা রাজ্য সরকারকে সারদার সন্দেহজনক গতিবিধির কথা জানায়। ২০১২ সালে সেবি সারদা সংস্থাকে বিনিয়োগ সংস্থা হিসেবে কাজ না করতে বলে, কিন্তু সারদা তাতে সাড়া দেয়নি। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে সংস্থা ধসে পড়ার আগে পর্যন্ত কাজ চালিয়ে গিয়েছে তারা।

ব্র্যান্ড তৈরির ব্যাপারে, জনমানসে সংস্থার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সারদা তথা সুদীপ্ত সেনের নজর ছিল সবচেয়ে বেশি। এ ব্যাপারে কাজে লাগানো হয়েছিল রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও সে দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন পরিচিত মুখকে। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করা হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ শতাব্দী রায়কে। সারদা গোষ্ঠীর মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করা হয় তৃণমূল কংগ্রেসের তৎকালীন রাজ্যসভা সাংসদ মিঠুন চক্রবর্তীকে।

তৃণমূল কংগ্রেসের আরেক সাংসদ কুণাল ঘোষকে সারদা মিডিয়া গোষ্ঠীর সিইও নিযুক্ত করা হয়। তিনি মাসে ১৬ লক্ষ টাকা বেতন পেতেন।  আরেক তৃণমূল সাংসদ সৃঞ্জয় বসুর সঙ্গে সারদা মিডিয়া গোষ্ঠী ছিল ঘনিষ্ঠ। তৃণমূল কংগ্রেসের পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্র ছিলেন সারদা গোষ্ঠীর কর্মী ইউনিয়নের শীর্ষে ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যেই সারদায় টাকা খাটানোর পরামর্শ দিতেন।

কলকাতা পুলিশকে মোটর সাইকেল উপহার দিয়েছিল সারদা গোষ্ঠী। রাজ্যের নকশাল অধ্যুষিত এলাকায় অ্যাম্বুল্যান্স এবং মোটর সাইকেল প্রদান করে সরকার, যা স্পনসর করেছিল সারদা গোষ্ঠী।

২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল সিবিআই-কে একটি চিঠি লেখেন সুদীপ্ত সেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতাদের তিনি প্রচুর পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন। কুণাল ঘোষের চাপাচাপিতেই যে তিনি লোকসানভোগী মিডিয়া গোষ্ঠীতে বিনিয়োগ করেন, এবং তাঁর ব্ল্যাকমেলের জন্যই বাজার দরের চেয়ে কম অর্থে একটি টেলিভিশন চ্যানেল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন, সে কথাও বলেছিলেন তিনি।

তদন্ত শুরুর পর তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। সিবিআই গ্রেফতার করে সৃঞ্জয় বসু, মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষকে। জেরা করা হয় টিএমসি সহ সভাপতি তথা রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি রজত মজুমদার, তৃণমূল যুব কংগ্রেসের প্রধান শঙ্কুদেব পাণ্ডা, সাংসদ শতাব্দী রায় এবং তাপস পালকে।
মমতার নির্ভরযোগ্য সাথী, বর্তমান বিজেপি নেতা মুকুল রায়কেও জেরা করেছিল সিবিআই।

সারদা কাণ্ডে সুদীপ্ত সেন গ্রেফতার হবার পর, গোটা সারদা প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ার পর, দেরাজ থেকে কঙ্কালের মত বেরিয়ে আসতে থাকে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সারদার যোগ। নাম জডায়নি, এমন কোনও নেতার সংখ্যা হাতে গোণা। আর সারা রাজ্য জুড়ে অসংখ্য তৃণমূলের ছোট-বড় নেতা কর্মীরা যে এই পঞ্জি স্কিমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাও প্রকাশ্য হতে থাকে।

সারদা কেলেংকারি ফাঁস হবার পর মমতা সরকার এর তদন্তে পুলিশের এক বিশেষ তদন্তদল গঠন করে। সে তদন্তদলের শীর্ষে ছিলেন রাজীব কুমার। অভিযোগ, বিশেষ তদন্ত দল সারদার সল্টলেকে অবস্থিত অফিস থেকে বেশ কিছু জিনিস বাজেয়াপ্ত করে, যার মধ্যে ছিল একটি লাল ডায়েরি ও একটি পেন ড্রাইভ। এই দুটিতেই নাকি ছিল যেসব প্রভাশালীদের অর্থ দেওয়া হয়েছে, তাদের নাম। সিবিআইয়ের বক্তব্য সিট এই দুটি জিনিস তাদের কাছে জমা দিচ্ছে না। এ ব্যাপারে রাজীব কুমারকে সন্দেহ করে তারা। সিবিআই রাজীব কুমারের বাড়িতে তল্লাশি করতে এলে, তা প্রতিক্রিয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গণতন্ত্র বাঁচানোর দাবিতে ৪৫ ঘন্টা ধর্নায় বসেন ধর্মতলা চত্বরে।

মমতার এই প্রতিক্রিয়ার পর, লাল ডায়েরি ও পেন ড্রাইভে কাদের নাম রয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ ঘোরতর হতে থাকে।