রাজ্যের পুলিশকর্মীদের দীর্ঘ ডিউটি এবং মানসিক চাপের সমস্যা সমাধানে নতুন ভাবনা প্রশাসনের। বিপুল নিয়োগের পাশাপাশি পুলিশকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখতে ‘মিউজিক থেরাপি’ চালুর প্রস্তাব জমা পড়েছে নবান্নে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে কর্মীদের কর্মদক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সকালে ডিউটিতে যোগ দেওয়ার পর কখন ‘রিলিজ়’ মিলবে, তার কোনও নিশ্চয়তা থাকে না বহু পুলিশকর্মীর জীবনে। বড় উৎসব, রাজনৈতিক কর্মসূচি, ভিআইপি নিরাপত্তা কিংবা থানার নিত্যদিনের কাজ— সব মিলিয়ে টানা ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা ডিউটি করতে হচ্ছে রাজ্যের একাংশের পুলিশকর্মীদের।

দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত কাজের চাপ, কর্মীর অভাব এবং অনির্দিষ্ট ডিউটি আওয়ার নিয়ে ক্ষোভ ছিল বাহিনীর অন্দরে। এবার সেই সমস্যার সমাধানে নতুন ভাবনা রাজ্য প্রশাসনের।
সূত্রের খবর, কলকাতা পুলিশ-সহ রাজ্যের পুলিশ বাহিনীতে বিপুল সংখ্যায় নিয়োগের পাশাপাশি পুলিশকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে ‘মিউজ়িক থেরাপি’ চালুর প্রস্তাব জমা পড়েছে নবান্নে।
সুর, ছন্দ এবং সংগীতের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর পদ্ধতিকেই বলা হয় ‘মিউজ়িক থেরাপি’। সাধারণত উদ্বেগ, অবসাদ, মানসিক ক্লান্তি বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি এই থেরাপি ব্যবহার করা হয়। বিশেষজ্ঞ মনোবিদ কিংবা চিকিৎসকেরা গান, বাদ্যযন্ত্র বা ধ্যানের মাধ্যমে রোগীর মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেন।
প্রশাসনের একাংশের মতে, পুলিশকর্মীদের ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ কমাতেও এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে।
রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে সাইবার অপরাধ, রাজনৈতিক কর্মসূচি, ভিআইপি নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত দায়িত্ব। কিন্তু সেই তুলনায় পুলিশকর্মীর সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়।
‘ব্যুরো অফ পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যার জন্য রাজ্যে অনুমোদিত পুলিশকর্মীর সংখ্যা ১৬৭ হলেও বাস্তবে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১০০ জনের কাছাকাছি। ফলে কর্মীদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
তুলনায় দেশের অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো। যেমন নাগাল্যান্ডে প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যা পিছু প্রায় ১,১০০ জন পুলিশকর্মী রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের পুলিশ ব্যবস্থায় বড়সড় সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সূত্রের খবর, প্রাথমিক ভাবে কলকাতা পুলিশ এবং রাজ্য পুলিশ মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার কর্মী নিয়োগ হতে পারে।
একই সঙ্গে নারী নিরাপত্তার জন্য ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ নামে একটি মহিলা পুলিশ ব্যাটেলিয়ন গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। নিয়োগের পরে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জ়োনে তাঁদের মোতায়েন করা হতে পারে। স্কুল-কলেজ সংলগ্ন নজরদারি, নারী সংক্রান্ত অভিযোগ মোকাবিলা এবং মহিলা নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে তাঁদের প্রধান দায়িত্ব।
পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠন নিয়ে ইতিমধ্যেই নবান্নে একটি বিস্তারিত প্রস্তাব জমা পড়েছে। প্রাক্তন আইপিএস অফিসার তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর (উত্তর)-এর বিজেপি বিধায়ক দেবাশিস ধর মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্তের সঙ্গে দেখা করে এই প্রস্তাব জমা দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
দেবাশিস ধরের বক্তব্য, রাজ্যে পুলিশ-জনসংখ্যার অনুপাত জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেকটাই কম। আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুলিশকর্মীদের কাজের পরিবেশ আরও উন্নত করা সম্ভব।
নবান্নে জমা পড়া রিপোর্টে পুলিশকর্মীদের নির্দিষ্ট শিফটে কাজ করানোর উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ডিউটি আওয়ার নির্ধারণ করা হলে কর্মীদের উপর চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
