সাধারণত তালগাছে একটি মাত্র কাণ্ড ও মাথায় ঝাঁকড়া পাতা থাকে। কিন্তু এবার বাংলায় মিলল ‘রাবণ তালগাছ’-এর সন্ধান। এই বিরল প্রজাতির তালগাছে রয়েছে একাধিক শাখা। পুরাণে রাবণের ১০টি মাথার সঙ্গে এর মিল থাকায় নাম ‘রাবণ তাল’। বীরভূম ও নদিয়ার দুটি জায়গায় এই গাছের খোঁজ পেয়ে চমকিত বনদপ্তর ও উদ্ভিদবিদরা।
তালগাছ মানেই আমাদের চোখে ভাসে লম্বা, সোজা একটা কাণ্ড। মাথায় গোল করে ঝাঁকড়া পাতা। ঝড়-বৃষ্টিতেও যে গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সেই চিরাচরিত ছবিটাই পাল্টে দিল বাংলার মাটি। রাজ্যের বীরভূম ও নদিয়া জেলায় খোঁজ মিলেছে একেবারে অন্যরকম তালগাছের। লোকমুখে যার নাম ‘রাবণ তালগাছ’।

এই গাছের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর শাখা। একটি মাত্র গোড়া থেকে বেরিয়েছে ৩ থেকে ৭টি পর্যন্ত মোটা ডাল। আর প্রতিটি ডালের মাথাতেই রয়েছে আলাদা করে পাতার মুকুট। দূর থেকে দেখলে মনে হবে একসাথে অনেকগুলো তালগাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। পুরাণে রাবণের ১০টি মাথার সঙ্গে এর গঠনগত মিল থাকায় স্থানীয়রা নাম দিয়েছেন ‘রাবণ তাল’।
কোথায় মিলল এই প্রাকৃতিক বিস্ময়? প্রথম খবর আসে বীরভূমের নানুর ব্লকের কয়েকটি গ্রাম থেকে। মাঠের আলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছটির বয়স আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০ বছর। গ্রামের বয়স্করা বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁরা এই গাছকে এমনই দেখে আসছেন।
এর কয়েকদিনের মধ্যেই নদিয়ার শান্তিপুরের কাছে ফুলিয়া অঞ্চলেও একই রকম দেখতে আরও ২টি গাছের সন্ধান মেলে। একটি স্কুলের মাঠে, অন্যটি পুকুরপাড়ে। পরপর ৩টি গাছের খবর ছড়াতেই চমকে যান বনদপ্তরের আধিকারিকরা।
বনদপ্তরের DFO সুদীপ্ত মুখার্জি বলেন, “Borassus flabellifer প্রজাতির তালগাছে মাল্টি-ব্রাঞ্চিং অত্যন্ত বিরল ঘটনা। সারা পৃথিবীতে এমন গাছ ১০টারও কম আছে। ভারতে কর্ণাটক, কেরল ও তামিলনাড়ুতে ২-১টির খবর আছে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম।”
বিজ্ঞান কী বলছে? এক কাণ্ড থেকে এত ডাল কেন? বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমেন দাস জানান, “এটাকে বলে ‘ডাইকোটমাস ব্রাঞ্চিং’। গাছ যখন ছোট থাকে, তখন কোনও কারণে তার অগ্রমুকুল বা apical meristem ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পোকা, বজ্রপাত বা জেনেটিক মিউটেশনের জন্য এমন হতে পারে। তখন গাছ বাঁচার জন্য একটির বদলে একাধিক বাড়ন্ত ডগা তৈরি করে।”
তিনি আরও বলেন, “এটা প্রকৃতির একটা অ্যাডাপটেশন। বিরল হলেও ক্ষতিকর নয়। বরং গবেষণার জন্য দারুণ বিষয়।”
বিজ্ঞান এক কথা বললেও গ্রামের মানুষের বিশ্বাস অন্যরকম। তাঁদের মতে, এই গাছে ‘দৈব শক্তি’ আছে। রাবণের মতো বহু মাথা থাকায় এই গাছ গ্রামের অমঙ্গল, বজ্রপাত ও ঝড় আটকায়। তাই নানুরের গাছটিকে ঘিরে প্রতি বছর বৈশাখে ছোট করে পুজোও হয়। গাছের গোড়ায় সিঁদুর, তেল দেওয়া হয়। কেউ ডাল কাটতে সাহস পায় না।
স্থানীয় শিক্ষক তপন ঘোষ বলেন, “আমরা ছোট থেকে শুনে এসেছি এটা রাবণ তাল। এই গাছ থাকলে গ্রামে খরা হয় না। এখন সরকারি লোকজন আসছে, ভালোই লাগছে।”
সংরক্ষণ ও পর্যটনের ভাবনা: খবর পাওয়ার পরই বনদপ্তর দুটি জেলার গাছগুলিকে ঘিরে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। কলকাতার ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং BSI-এর বিজ্ঞানীরা DNA স্যাম্পেল সংগ্রহ করতে আসছেন। গাছগুলির স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বংশবিস্তারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।
পর্যটন দপ্তরের পরিকল্পনা, ‘রাবণ তাল সার্কিট’ তৈরি করা। বীরভূম ও নদিয়ার এই গাছগুলিকে নিয়ে ইকো-ট্যুরিজমের মানচিত্রে আনা হবে। সাথে থাকবে স্থানীয় লোকশিল্প ও গল্প।
একটা সাধারণ তালগাছ যে এভাবে রাজ্যের বিস্ময় হয়ে উঠতে পারে, তা কেউ ভাবেনি। প্রকৃতির খেয়ালে জন্ম নেওয়া এই ‘রাবণ তাল’ এখন শুধু গাছ নয়, বাংলার নতুন গর্ব।


