‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতি অবমাননা এবং জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি কংগ্রেসের ধারাবাহিক অবজ্ঞার অভিযোগ তুলে সনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখলেন নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক এবং ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বংশধর শ্রী সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, সনিয়ার কাজ সত্যিই লজ্জাজনক ছিল। এটা দেশের প্রতি অপমান। সমগ্র ভারত এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতি অপমান।

‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতি অবমাননা এবং জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি কংগ্রেসের ধারাবাহিক অবজ্ঞার অভিযোগ তুলে সনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখলেন নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক এবং ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বংশধর শ্রী সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, সনিয়ার কাজ সত্যিই লজ্জাজনক ছিল। এটা দেশের প্রতি অপমান। সমগ্র ভারত এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতি অপমান। সুমিত্র লিখেছেন, আমার পুরো পরিবার কষ্ট পেয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, এতদিন ভারতে থেকেও সনিয়া গান্ধী তাঁর ইতালিয় সংস্কৃতি ভোলেননি। গোটা ঘটনায় সনিয়া গান্ধীর ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন সুমিত্র।

চিঠিতে কী লিখেছেন সুমিত্র?

তিনি লিখেছেন, "ভারতের স্বাধীনতার আশিতম বর্ষপূর্তির এই পুণ্য প্রভাতে, যখন সমগ্র দেশবাসী দেশমাতৃকার বন্দনায় ব্রতী, ঠিক সেই সময় সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সদর দফতরে যা ঘটল, তা কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয়, এটি এক ঐতিহাসিক স্খলনের নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি। কংগ্রেস কর্মীরা যখন যুগর্ষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘বন্দে মাতরম্' -এর পূর্ণাঙ্গ রূপ পরিবেশন করছিলেন, তখন আপনার শারীরিক ভাষায় যে দৃশ্যমান অস্বস্তি, বিরক্তি এবং বারবার থামানোর প্রয়াস প্রকাশ পেয়েছে, তা আমাকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিক, দেশপ্রেমিক এবং সর্বোপরি, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের পরিবারের একজন প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি হিসেবে আজ এক চরম শূন্যতা ও ক্ষোভ থেকে আমি এই পত্রের অবতারণা করছি। আপনারা হয়তো বিস্মৃত হয়েছেন, কিন্তু ইতিহাস ভোলে না। স্মরণ করিয়ে দিই, ঋষি অরবিন্দ লিখেছিলেন,মন্ত্রটি দেওয়া হয়েছিল এবং একটিমাত্র দিনের মধ্যেই একটি সমগ্র জাতি দেশপ্রেমের ধর্মে দীক্ষিত হয়ে উঠল। উনি বলেন, এটি শুধু মন্ত্র নয়, এটি দেশপ্রেমের ধর্ম। এই অমোঘ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই ক্ষুদিরাম বসুর মতো অসংখ্য অকুতোভয় বিপ্লবী ফাঁসির মঞ্চে উঠে হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন। আজ স্বাধীন ভারতের মাটিতে, সেই মন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ উচ্চারণে আপনাদের এই অসহিষ্ণুতা সেই লক্ষ লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা। একটু পিছন ফিরে আপনাদের পূর্বসূরিদের দিকে তাকান। প্রবাদপ্রতিম জাতীয়তাবাদী নেতা বিপিনচন্দ্ৰ পাল লিখেছিলেন যে, বঙ্গভঙ্গের পর থেকে ‘বন্দে মাতরম্' ছিল প্রতিটি বিপ্লবীর ওষ্ঠে> 'স্বদেশী', 'বয়কট' আর 'বন্দে মাতরম্', এই তিন শব্দ হয়ে উঠেছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণবন্ত সমার্থক শব্দ। ১৯০৫ সালের বেনারস কংগ্রেস অধিবেশনে স্বয়ং সরলা দেবী চৌধুরানী এই পূর্ণাঙ্গ 'বন্দে মাতরম্' পরিবেশন করেছিলেন। লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক, ১৯০৯ সালে তাঁর রাজদ্রোহের বিচারে আদালত-প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তাঁর অগণিত সমর্থকদের কণ্ঠে এই গান শুনেছিলেন। অন্যদিকে, ১৯৩৮ সালে হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্র-আন্দোলনের মূল মন্ত্রই ছিল এই 'বন্দে মাতরম্', যা নিজামের স্বৈরাচারী নিষেধাজ্ঞার মুখেও মাথা নত করেনি।"

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বংশধর আরও লেখেন, "১৮৯৬ সালের জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং নিজের সুরে এই গান পরিবেশন করেছিলেন। তিনি এই গানের অন্তর্নিহিত শক্তি সম্পর্কে লিখেছিলেন, এই জাদু- শব্দগুচ্ছ তাঁর লোহার সিন্দুকের দ্বার খুলে দেবে, তাঁর মজবুত প্রাচীর ভেঙে দেবে এবং যাঁরা এই আহ্বানের প্রতি অবিশ্বস্ত, তাঁদের হৃদয়কে বিচলিত করবে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে অবশ্য দেখা যায়, আপনাদের এই দ্বিচারিতা নতুন কিছু নয়। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে মহম্মদ আলি জিন্নাহর অন্যায্য আপত্তির মুখে নির্লজ্জভাবে নতি স্বীকার করে আপনারাই এই কালজয়ী বন্দনাগানটিকে খণ্ডিত করেছিলেন। সেদিনের সেই আপসের ধারাবাহিকতা আজও আপনাদের মননে বহমান, যা আজ আপনাদের আচরণের মাধ্যমে পুনরায় নগ্নভাবে উন্মোচিত হলো। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, আপনাদেরই ছাত্র সংগঠন, 'পশ্চিমবঙ্গ ছাত্র পরিষদ', তাদের স্লোগান "মন্ত্র মোদের সঞ্জীবন - বন্দে মাতরম"। যে গান আপনাদের নিচুতলার কর্মী ও সংগঠনের গর্বের স্লোগান, শীর্ষ নেতৃত্ব কেন তাকে এত ভয় পান? সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে গত পরশু, ১৩ই আগস্ট। স্বাধীন ভারতের সংসদে লোকসভার অধিবেশন ঐতিহাসিকভাবে ছয় স্তবকের সম্পূর্ণ 'বন্দে মাতরম্' দিয়ে শুরু হয়েছে, এবং সেই সময় প্রধানমন্ত্রীর পাশেই উপস্থিত ছিলেন আপনাদেরই দলের লোকসভার বিরোধী দলনেতা। সংসদ যখন সর্বসম্মতিক্রমে এবং শ্রদ্ধাবনত চিত্তে এই গানের পূর্ণ মহিমাকে গ্রহণ করছে, তখন কংগ্রেসের নিজস্ব সদর দফতরের অন্দরে সেই একই গানের সামনে আপনাদের এই কৃত্রিম দ্বিধা ও বিরক্তি কেন? ‘বন্দে মাতরম্' কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি, বঙ্কিমচন্দ্রের শাশ্বত উত্তরাধিকার এবং লক্ষ শহিদের রক্তের মূল্যে কেনা এক পবিত্র প্রতীক। এই গানকে সম্মান জানানো মানেই ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসকে সম্মান জানানো। আজকের এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অনুভূতি যে গভীরভাবে আহত হয়েছে, তা আপনাকে জানানো আমার নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করি। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের একজন উত্তরসূরি হিসেবে আমি আপনাকে বিনীত অথচ অত্যন্ত দৃঢ় স্বরে অনুরোধ করছি, আপনারা আত্মবিশ্লেষণ করুন এবং আপনাদের এই আচরণের জন্য সমগ্র দেশবাসীর কাছে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না; যে নেতৃত্ব তার নিজের স্বাধীনতার মন্ত্রকে সম্মান করতে জানে না, ইতিহাস তাদের বিস্মৃতির অতলেই নিক্ষেপ করে।"

এদিকে, 'বন্দে মাতরম' পরিবেশন মাঝপথে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তুলে জন্য রবিবার কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্লজ্জতার অভিযোগ আনলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, এই পাপ দেশবাসী কখনও ক্ষমা করবে না। চিত্তোরগড়ে এক জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় শাহ অভিযোগ করেন যে, স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেস সদর দফতরে যখন জাতীয় সঙ্গীত 'বন্দে মাতরম' গাওয়া হচ্ছিল, তখন কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধী দলের সভাপতিকে তা থামানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। শাহ বলেন, "ওদের (কংগ্রেসের) নির্লজ্জতা দেখুন। কংগ্রেস দলের সদর দফতরে 'বন্দে মাতরম' গাওয়া হচ্ছিল। সেই সময় কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধী কংগ্রেস সভাপতিকে গানটি থামানোর কথা বলেন। আমরা সবাই তা টিভিতে দেখছিলাম।" তিনি আরও বলেন, "সোনিয়া জি, ১৪০ কোটি মানুষ আপনাকে দেখছে। আপনি যে পাপ করেছেন, তা এ দেশের মানুষ কখনও ক্ষমা করবে না। 'বন্দে মাতরম' সঙ্গীত অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়ার কথা কেউ কীভাবে ভাবতে পারে? কংগ্রেসের মানুষের লজ্জা হওয়া উচিত।" শাহ দাবি জানান যে, কংগ্রেসের উচিত দেশবাসীর কাছে এবং 'বন্দে মাতরম'-এর রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়া। শাহ বলেন, "যদি বিন্দুমাত্র লজ্জা অবশিষ্ট থাকে, তবে হাত জোড় করে বঙ্কিমবাবুর অমর আত্মা ও দেশবাসীর কাছে আপনাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।"

কংগ্রেস সদর দফতরে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের একটি দৃশ্য প্রকাশ্যে আসার পরই এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ওই দৃশ্যে দেখা যায়, 'বন্দে মাতরম' পরিবেশনের সময় দলের প্রবীণ নেতারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছেন। এরপরই বিজেপি নেতারা দাবি করেন যে, এই আচরণ জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল।