- Home
- West Bengal
- মুসলিম অধ্যুষিত রেজিনগরে কীভাবে জিতল বিজেপি? এই পাঁচ ফ্যাক্টরেই কেল্লাফতে শুভেন্দুর
মুসলিম অধ্যুষিত রেজিনগরে কীভাবে জিতল বিজেপি? এই পাঁচ ফ্যাক্টরেই কেল্লাফতে শুভেন্দুর
মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বিজেপির জয় ঘিরে রাজনৈতিক মহলে চর্চা তুঙ্গে। বিরোধী ভোটের বিভাজন, হুমায়ুন কবিরের প্রভাব, প্রার্থী নির্বাচন এবং শুভেন্দু অধিকারীর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি—কোন কোন কারণে বদলাল নির্বাচনী সমীকরণ? জানুন বিস্তারিত।

মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বিজেপির জয়
মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বিজেপির জয় ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। প্রায় ৭০ শতাংশ মুসলিম ভোটার অধ্যুষিত এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকারের জয়কে রাজনৈতিক সমীকরণের বড় পরিবর্তন হিসেবেই দেখছেন অনেকে। যে কেন্দ্রে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন ছিল, সেখানেই জয় গেরুয়া শিবিরের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তা হলে কি সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশও এবার বিজেপির দিকে ঝুঁকলেন? শুভেন্দু অধিকারীর উন্নয়নের বার্তা কি প্রভাব ফেলল ভোটে? নাকি বিরোধী ভোটের বিভাজনই বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত করল? এই প্রশ্নগুলিই এখন রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।

বিরোধী ভোটের বিভাজনেই কি বাড়তি সুবিধা বিজেপির?
রেজিনগরে বিজেপির জয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে বিরোধী ভোটের বিভাজন। শাখারভ সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে ছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির গুলাম নবি আজাদ, তৃণমূল কংগ্রেসের রবিউল আলম চৌধুরী, ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেসের সফিউজ্জামান শেখ এবং কংগ্রেসের মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফি-সহ একাধিক প্রার্থী।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, একাধিক দলের মধ্যে বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় বিজেপি সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে যায়। তৃণমূল, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, কংগ্রেস এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। তবে শুধু ভোটের বিভাজন দিয়েই এই জয়কে ব্যাখ্যা করা যায় না বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, তৃণমূলের পাশাপাশি আম জনতা উন্নয়ন পার্টির উপস্থিতিও নির্বাচনী লড়াইকে জটিল করে তুলেছিল।
শুভেন্দুর উন্নয়নের বার্তাই কি মাস্টারস্ট্রোক?
রেজিনগরে প্রচারে শুভেন্দু অধিকারী একাধিক উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। ২০০ শয্যার হাসপাতাল, নতুন সেতু, কলেজ এবং শিল্প পার্ক তৈরির মতো বিষয়গুলি প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনা এবং স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই প্রতিশ্রুতিগুলির মাধ্যমে বিজেপি ভোটারদের কাছে উন্নয়ন ও জীবিকার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে চেয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে নাগরিক পরিষেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কাজের সুযোগের মতো বিষয়কে সামনে রাখার কৌশল ভোটে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। তবে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিই বিজেপির জয়ের একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে বুথভিত্তিক ভোটের পরিসংখ্যান ও অন্যান্য নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বাবরি মসজিদের আবেগ নয়, প্রচারে গুরুত্ব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে
রেজিনগরের উপনির্বাচনে বিজেপির প্রচারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে সামনে রাখা। বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে আবেগের রাজনীতির বদলে প্রচারের শেষ পর্যায়ে সেতু, হাসপাতাল, কলেজ, শিল্প পার্ক এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলিতে জোর দেয় বিজেপি।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকায় প্রচার করে দাবি করেছিলেন, সাধারণ মানুষ ধর্মীয় বিতর্কের চেয়ে উন্নয়ন ও কাজের সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও স্থানীয় পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই কৌশলের মাধ্যমে প্রচলিত ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির বাইরে গিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছে বিজেপি।
হুমায়ুন কবিরের প্রভাব কি কমল?
রেজিনগরের আগের নির্বাচনী ফলের সঙ্গে উপনির্বাচনের পরিস্থিতির তুলনা করলেও রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবির এই কেন্দ্র থেকে ১,২৩,৫৩৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, সেই নির্বাচনে বিজেপির বাপন ঘোষ পেয়েছিলেন ৬৪,৬৬০ ভোট এবং তৃণমূলের আতাউর রহমান পেয়েছিলেন ৪১,৭১৮ ভোট।
পরে হুমায়ুন কবির নওদা কেন্দ্রটি ধরে রেখে রেজিনগর আসন ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচনে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাঁর ছেলে গুলাম নবি আজাদকে প্রার্থী করে আসনটি ধরে রাখার চেষ্টা করে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি। কিন্তু সেই কৌশল সফল হয়নি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, হুমায়ুন কবিরের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তা তাঁর ছেলের ক্ষেত্রে একই মাত্রায় কাজ করেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনী ময়দানে তুলনামূলক নতুন মুখ হওয়াও গুলাম নবি আজাদের পক্ষে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
ভোটের দিন হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে বিতর্ক
৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণের দিন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘাত এবং তাঁকে আটক করার ঘটনাও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায়। হুমায়ুন কবির ভোটপ্রক্রিয়ায় পুলিশের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছিলেন। অন্যদিকে, ভোটে কারচুপির অভিযোগ অস্বীকার করেছিল বিজেপি ও রাজ্য নেতৃত্ব। ভোটের দিন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চাপ নির্বাচনী পরিবেশে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
কী বলছেন বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার?
জয়ের পর সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন নিয়ে নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার। তাঁর দাবি, ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন মানুষ। তিনি বলেন, “সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু, এ সব কথা বলবেন না। এসব শুনে বাংলার মানুষ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। বাংলায় এখন একটাই ক্যাসেট বাজবে, এখানে উন্নয়ন চাই, রেজিনগরে কলেজ চাই, শিল্প চাই।”
শাখারভের বক্তব্য, অতীতে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থনের অভিমুখ বদলেছে। তাঁর দাবি, এবার উন্নয়নের স্বার্থেই সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশ বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। যদিও এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে ভোটের সামগ্রিক ফলের পাশাপাশি বুথভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি।
সব মিলিয়ে, রেজিনগরে বিজেপির জয় রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী ভোটের বিভাজন, আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতৃত্বের প্রভাব, প্রার্থী নির্বাচনের কৌশল এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই কি এই ফল? নাকি সংখ্যালঘু ভোটের মধ্যেও নতুন রাজনৈতিক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে? সেই উত্তর খুঁজতে এখন নজর থাকবে নির্বাচনী পরিসংখ্যান ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে।
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.

