সাইক্লোন বুলবুল-এর পর প্রায় মাস পূরণ হতে চলল। কিন্তু, সাইক্লোনের পর এখন এক নয়া আতঙ্ক চেপে বসেছে সুন্দরবনবাসীদের মধ্যে। আর এই আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সুন্দরবনের তিনটি দ্বীপ-কে নিয়ে। এই দ্বীপগুলি হল- সাগর, ঘোরামারা এবং মৌসুনি। সুন্দরবনের পশ্চিমদিকে থাকা এই তিন দ্বীপ বহুদিন ধরেই একটু একটু করে জলের তলায় চলে যাচ্ছে। এই নিয়ে উদ্বেগেও রয়েছেন পরিবেশবিদরা। এই পরিস্থিতিতে সাইক্লোন বুলবুল যে ধাক্কাটা এই তিন দ্বীপের উপর দিয়েছে তাতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মনে করা হচ্ছে সাইক্লোন বুলবুল-এর জেরে এই তিন দ্বীপের তলিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হতে পারে। ফলে, কার্যক্ষেত্রে এই তিনটি দ্বীপের তলিয়ে যাওয়া নিয়ে যে সময়টা ধরা হয়েছিল, সেটা কমে আসার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এর জেরে কলকাতার আবহাওয়া এবং বাস্তুতন্ত্রেও ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। 

৯ নভেম্বর ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার বেগে আঁছড়ে পড়েছিল বুলবুল। যার মূল শিকার হয়েছিল সাগর, ঘোরামারা এবং মৌসুনি দ্বীপ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ম্যানগ্রোভ-এর অরণ্য। এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উপর দিয়ে বুলবুল ঢুকে পড়েছিল বাংলাদেশের অংশে থাকা সুন্দরবন এলাকাতে। ইন্টার-গভর্মেন্ট প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আইপিসিসি-র অন্যতম একজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ জয়শ্রী রায় বুলবুল-এর আঁছড়ে পড়ার পরই ইংরাজি সংবাদপত্র টাইমস অফ ইন্ডিয়া-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যেভাবে ম্যানগ্রোভ প্রভাবিত হচ্ছে তাতে সুন্দরবনের বিপদ বাড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জয়শ্রী-র মতে দক্ষিণবঙ্গের প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় এই ম্যানগ্রোভ ঢালের মতো কাজ করে। কিন্তু, ঝড়ের ধাক্কায় সেই ম্যানগ্রোভ-ই যদি ধ্বংসের মুখে পতিত হয় তাহলে দক্ষিণবঙ্গের পক্ষে তা আশঙ্কার। 

বুলবুল-এর পরপরই ক্ষতি জরিপ করতে বেরিয়ে পড়েছিলেন রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান পরিবেশবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র। তিনিও, টাইমস অফ ইন্ডিয়া-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, মানুষের বসতি স্থাপনের জন্য সুন্দরবনের পশ্চিমপ্রান্তে যথেচ্ছভাবে প্রভাবিত হয়েছে ম্যানগ্রোভ। বুলবুল প্রমাণ করে দিয়েছে এই ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। 

বুলবুল-এর জেরে সামনে এসেছে এমন কিছু মানুষের কাহিনি যারা সুন্দরবনের এই তিন দ্বীপের বাসিন্দা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য একাধিকবার ভিটে-মাটি হারিয়েছেন।  বুলবুলের জেরে এদের মধ্যে অনেকেরই ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকী, কারোর কারোর ঘরবাড়ি পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছে। এই সব মানুষদের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছেন, যাদের ভিটে মাটি দ্বীপের কিছু অংশ জলে তলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। স্বভাবতই এই সব মানুষদের দল নতুন করে উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কায় মরছেন। 

বিখ্যাত আবহ বিশেষজ্ঞ আইআইটি দিল্লি-তে কর্মরত কৃষ্ণা অচ্যুত রাও জানিয়েছেন, ভারতের যে অংশে সবচেয়ে বেশি করে সমুদ্রের জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার নাম হল সুন্দরবন।  ঘোরামারা দ্বীপের বাসিন্দা মফিসুল ইসলাম একটা সময় চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখেছিলেন তার ভিটে-মাটি। বলতে গেলে সুন্দরবন এলাকায় তিনিও একজন ক্লাইমেট-রিফিউজি। এরপর ঘোরামারা দ্বীপেরই একটি প্রান্তে বাড়ি করেছেন তিনি। আপাতত সেটাও হারানোর ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন তিনি। এমনকী, যেভাবে সাইক্লোনের জেরে সমুদ্রের জল ক্ষেতে প্রবেশ করছে তাতে ফসল নষ্ট হচ্ছে। নোনা জলের প্রভাব পড়ছে জমির উর্বরতাতেও। স্বাভাবিকভাবেই চরতম দুঃশ্চিন্তায় মফিসুল। 

বুলবুলের পর প্রায় মাস পূরণ হতে এলেও এখনও সাগর, ঘোরামারা এবং মৌসুনি দ্বীপের বহু অংশেই নোনা জলের তলায় রয়েছে চাষের জমি। পরিস্থিতি এমনই যে সেখান থেকে জল সেচ করেও বের করা সম্ভব নয়। অ্যাটমোস্ফেয়ারিক সায়েন্টিস্টদের দলও জানিয়েছে যে গত ১০০ বছরে বঙ্গোপসাগরের এই অংশে সাইক্লোন তৈরির প্রবণতা ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে এটা ঘটছে বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য। যার জেরে একটুতেই দ্রুত গতিতে শক্তি সঞ্চয় করছে এইখানে তৈরি হওয়া সাইক্লোন। প্রকৃতির এই  রূপ বদলের মোকাবিলা যে চাট্টিখানি কথা নয় তা মানছেন পরিবেশবিদরা। যার জন্য এই তিন দ্বীপের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যাওয়া ছাড়া কোনও গতি নেই বলে মনে করা হচ্ছে।