রাতে হাসপাতালের ওয়ার্ডে রাউন্ডে গিয়েছিলেন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ। তখনই তিনি দেখলেন রক্তের অভাবে অবস্থা খারাপ হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত দুই শিশুর। দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে নিজেই ব্লাড ব্যাঙ্কে গিয়ে রক্ত দিয়ে দুই শিশুর প্রাণ বাঁচালেন ওই চিকিৎসক। গোটা রাজ্যে যখন চিকিৎসদের একাংশের কর্মবিরতিতে পরিষেবা থমকে যাওয়ার জোগাড়, তখন রায়গঞ্জের সরকারি হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকল বিহারের বাসিন্দা দরিদ্র এক পরিবার। 

শনিবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে রায়গঞ্জ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় শিশুদের ওয়ার্ডে গিয়ে ওই দুই শিশুর কথা জানতে পারেন। বিহারের কাটিহার জেলার আনাদপুর থেকে রায়গঞ্জ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল পাঁচ বছরের মহম্মদ জিশান এবং দু' বছরের আরজান ঋতুকে। জিশান এবং আরজান ভাই বোন, দু' জনেই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত। দু' জনেই নীলাঞ্জনবাবুর অধীনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়। শনিবার নীলাঞ্জনবাবু যখন তাদের দেখেন, তখন রক্তের অভাবে দু' জনেরই শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। এমন কী, প্রাণ সংশয়েরও ভয় ছিল। 

নীলাঞ্জনবাবু জানতে পারেন, শিশু দু' টির এ পজিটিভ গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন। অথচ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে ওই গ্রুপের রক্ত নেই। ঘটনাচক্রে নীলাঞ্জনবাবুর রক্তের গ্রুপও এ পজিটিভ। দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে নিজে ব্লাড ব্যাঙ্কে ছুটে যান ওই চিকিৎসক। নিজে প্রয়োজনীয় রক্ত দিয়ে শিশু দু' টিকে তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। রক্ত পাওয়ার পরে জিশান এবং আরজানের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। হাসি ফোটে তাদের বাবা-মায়ের মুখে। 

শিশু দু' টির বাবা মহম্মদ আরজু পেশায় রং মিস্ত্রি। চিকিৎসক নীলাঞ্জনবাবু প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তিনি জানান, 'তিন দিন ধরে রায়গঞ্জ হাসপাতালে ছেলেমেয়েকে ভর্তি করেছি, কিন্তু রক্ত পাচ্ছিলাম না। ডাক্তারবাবু নিজে রক্ত দিয়ে যেভাবে ওদের প্রাণ বাঁচালেন, তা আমরা কোনওদিন ভুলতে পারব না। একই ভাবে নীলাঞ্জনবাবুর উদ্যোগে মুগ্ধ শিশু দু' টির মা নাজিমা খাতুনও। 

আর নীলাঞ্জনবাবু নিজে বলছেন, 'ওদের তো অল্প পরিমাণেই রক্ত লাগে, তাই যখন বুঝলাম যে বাচ্চা দুটোর রক্ত প্রয়োজন, তখন আর দেরি করিনি। এটা খুব সামান্য কাজ, আমাদের অনেক সহকর্মীরাই এমন করে থাকেন।' এনআরএস কাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, 'সমাজের অধিকাংশ মানুষই আমাদের পাশে আছে। দেওয়ালে পিঠ না ঠেকে গেলে কোনও চিকিৎসক পরিষেবা বন্ধ করতে চান না। সবাইকে বলব, সুস্থভাবে আমাদের চিকিৎসা করার সুযোগটুকু করে দিন।'