ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের পরদিনই কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করলেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। দিল্লিতে যখন এই সৌজন্য বৈঠক চলছে, ঠিক তখনই সই জালিয়াতির মামলায় কলকাতায় মমতার বাড়িতে পৌঁছায় সিআইডি।
একদিকে যখন দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের পর কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করছেন তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) নেত্রী মমতা বন্দ্যযোপাধ্যায়, ঠিক সেই সময়েই কলকাতায় তাঁর বাড়িতে হানা দিল সিআইডি। সূত্রের খবর সইন জালিয়াতি মামলার তদন্তেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের কালীঘাটের বাড়ি সংলগ্ন তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিসে গিয়েছিল সিআইডি। এই ঘটনায় দলের অন্দরের অস্বস্তি আরও একবার প্রকাশ্যে চলে এল।

সোনিয়ার বাড়িতে মমতা
সোমবার ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের বৈঠকে মমতা ও সোনিয়া দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। এরপর মমতার এই সাক্ষাৎ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এক্স-হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে লেখে, "যেখানে কথা শেষ হয়ে যায়, সেখানে হাসিই সব বলে দেয়... কয়েক দশক ধরে দেশের সেবায় গড়ে ওঠা এক মজবুত বন্ধন। আমাদের চেয়ারপার্সন আজ দিল্লিতে সোনিয়া গান্ধীজির সঙ্গে।"

তৃণমূল ভেঙে খান খান
কিন্তু এই হাসিমুখের ছবির আড়ালেই রয়েছে দলের গভীর সংকট। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটে হারের পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের দলের অন্দরে সমস্যায় পড়েছেন। বিরোধী দলনেতা কে হবেন, সেই বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত দলের বড় অংশের বিধায়করাই মানেননি। উল্টে, তাঁদেরই বিধানসভায় বিরোধী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর উপর, দলের প্রায় ২০ জন লোকসভা সাংসদ আলাদা গোষ্ঠী তৈরির চেষ্টা করছেন বলে খবর, যা সংকট আরও বাড়িয়েছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই সই জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে তদন্তে নেমেছে সিআইডি। এর আগে তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জির বাড়িতেও গিয়েছিল সিআইডি-র একটি দল। এবার তারা মমতার বাড়িতে পৌঁছায়।
কী এই সই জালিয়াতির মামলা?
তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের সই জাল করার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে রাজ্য সিআইডি পাঁচ সদস্যের একটি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT) তৈরি করেছে। এই টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের একজন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (DIG)।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দলের পদাধিকারী নিয়োগের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকারকে পাঠানো দলের মূল প্রস্তাবের কপিটি জমা দিতে বলা হয়েছে অভিষেক ব্যানার্জিকে। তৃণমূল কংগ্রেস সূত্রের খবর, অভিষেক তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে এজেন্সিকে একটি চিঠি দিয়ে জবাব দিয়েছেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে সিআইডি ইতিমধ্যেই ১৩ জন তৃণমূল বিধায়কের বয়ান রেকর্ড করেছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন বিধায়ক জানিয়েছেন, গত ৬ মে-র মিটিং রেজোলিউশন বইতে থাকা সইটি তাঁদের নয়। ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক তো এমনও বলেছেন যে, তিনি কলকাতাতে হওয়া ওই বৈঠকে যোগই দেননি।
এরপরই সিআইডি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়কে মিটিংয়ের মূল রেজোলিউশন খাতাটি নিয়ে তদন্তকারী অফিসারের সামনে হাজির হতে বলে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায় ৯ মে স্পিকারকে জানান যে, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (AITC) পরিষদীয় দলের বৈঠকে পদাধিকারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর ১৮ মে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধ্যক্ষ সচিব অভিষেককে চিঠি দিয়ে সেই বৈঠকের কার্যবিবরণী এবং উপস্থিত বিধায়কদের সই-সহ প্রস্তাব জমা দিতে বলেন। ২০ মে, অভিষেক মিটিং রেজোলিউশন বইয়ের একটি কপি জমা দেন, যেখানে বলা হয় ৬ মে-র বৈঠকে ৭০ জন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন।
কিন্তু ২৭ মে, দুজন তৃণমূল বিধায়ক স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেন যে ৬ মে বিরোধী দলনেতা নির্বাচন নিয়ে কোনও প্রস্তাবই পাশ হয়নি এবং তাঁরা ১৯ মে তারিখে রেজোলিউশন বইতে সই করেছিলেন। অভিযোগকারীরা আরও বলেন, ৬ মে তারিখের প্রস্তাবটি ছিল "বানানো এবং জালিয়াতি করা", যেখানে প্রায় ১৪টি সই ব্লক লেটারে করা ছিল। পরে দলবিরোধী কাজের জন্য এই দুই বিধায়ক - ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাকে সাসপেন্ড করে তৃণমূল।
বিধানসভার অধ্যক্ষ সচিবের অভিযোগের ভিত্তিতে, হেয়ার স্ট্রিট থানা ২৭ মে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) অধীনে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের বিভিন্ন ধারায় একটি মামলা দায়ের করে। ২৮ মে সিআইডি এই তদন্তের ভার নেয়।


