সুপ্রিম কোর্ট রায় দেওয়ার পর কেটে গিয়েছে চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময়। কিন্তু এখনও অযোধ্যা মামলার রায় নিয়ে মুখে কুলুপ তৃণমূল কংগ্রেসের। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো বটেই, তৃণমূলের প্রথমসারির কোনও নেতাই এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। সাধারণত সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তৃণমূলের মুখপাত্র হিসেবে প্রতিক্রিয়া জানান, সেই সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েনও অযোধ্যা রায় নিয়ে দলের অবস্থান সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করেননি। 

শনিবার দিনভর ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের মোকাবিলার প্রস্তুতির উপর নজরদারিতে ব্যস্ত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা তৃণমূলের মন্ত্রীরা। আবার এ কথাও ঠিক, অযোধ্যা মামলার রায় সকাল এগারোটা নাগাদ স্পষ্ট হয়ে যায়। আর বুলবুল হানা দিয়েছে সন্ধের পর। ফলে রায়দান নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলের কাছে অনেকটাই সময় ছিল। তার পরেও এ বিষয়ে রাজ্যের শাসক দলের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া না আসার পিছনে নিখুঁত রাজনৈতিক অঙ্কই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী অবশ্য তৃণমূলনেত্রীর এই কৌশলের পিছনে প্রশান্ত কিশোরের মাথা দেখছেন। বিশ্বনাথবাবু বলেন, 'প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শেই বিতর্কিত বিষয় নিয়ে মন্তব্যে বিরত থাকছেন মুখ্যমন্ত্রী। অযোধ্যা মামলার রায় নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দিলে হিন্দুদের তাঁর উপর চটে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। যা তাঁর দলের হিন্দু ভোটে ফাটল ধরাত।' বিশ্বনাথবাবুর মতে, রায় নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া না দিলেও তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কে কোনও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, অযোধ্যা রায়ের পরে সংখ্যালঘু ভোটারদের বিজেপি-র দিকে ঝোঁকার সামান্যতম সম্ভাবনাটুকুও যে নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তাও ভালভাবে বুঝে গিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। ফলে সবকিছু ভেবেচিন্তেই অযোধ্যা রায় নিয়ে তৃণমূল মুখে কুলুপ এঁটেছে বলেই মত বিশ্বনাথবাবুর। 

শনিবারও অযোধ্যা রায় নিয়ে রাজ্যের পুরমন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনিও উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান। অযোধ্যা রায় নিয়ে রাজ্যের শাসক দলের এই অবস্থানে অবশ্য বিজেপি- তৃণমূলের আঁতাতই দেখছে বাম এবং কংগ্রেস। 

সিপিএম বিধায়ক তন্ময় ভট্টাচার্য বলেন, 'তৃণমূল সব বিষয়েই সংকীর্ণ রাজনীতি করে। তাদের যে কোনও নীতিগত অবস্থান নেই, এই ঘটনায় তা আবার প্রমাণিত হল। তাছাড়া বিজেপি-র মতোই তৃণমূলও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে। গোপন বোঝাপড়া রয়েছে বলে বিজেপি-কে চটিয়েও তৃণমূল কিছু বলতে পারবে না। তাহলে নারদা- সারদা তদন্তে ফের তৃণমূল নেতাদের চেপে ধরা হবে। আর এই রায়ের পক্ষে কিছু বললে সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার ভয় রয়েছে। ফলে, তৃণমূলের কৌশলগত দিক থেকে এই অবস্থান সঠিক। কিন্তু আমরা মানুষের কাছে গিয়ে বলব, যে রাজনৈতিক দল এত বড় ঘটনা নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চুপ, তাঁদের কি কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা আছে?'

একই অভিযোগ তুলেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রও। তিনি বলেন, 'তৃণমূল- বিজেপির গোপন বোঝাপড়া এর থেকেই স্পষ্ট। সেই কারণেই বিজেপি-কে চটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে পারলেন না। রাজীব কুমার কেন বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেটাও এবার পরিষ্কার হল।'

সিপিএম- কংগ্রেস যাই বলুক না কেন, অযোধ্যায় রায় নিয়ে মুখ না খোলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেছেন বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু। মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে তাঁর প্রতিক্রিয়া, 'যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সব বিষয়ে আগ বাড়িয়ে প্রতিক্রিয়া দেন,তিনি এতবড় একটা ঘটনায় চুপ করে আছেন। এতে আমরাও বেশ অবাক। দেখা যাক, উনি কতদিন চুপ করে থাকেন।' তবে তৃণমূলের এই অবস্থান নিয়ে বিজেপি-র মধ্যেও অন্য মত রয়েছে। বিজেপি-র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক রাহুল সিনহা অবশ্য তৃণমূলের অবস্থান নিয়ে মন্তব্যে নারাজ। তিনি বলেন, 'কে কী বলল বা বলল না. তা নিয়ে কিছু প্রতিক্রিয়া দেব না। আমরা চাই মানুষ শান্তিতে থাকুক।'

মাত্র কয়েক মাস আগে লোকসভা নির্বাচনের সময় বিরোধীদের একজোট করে বিজেপি বিরোধী জোট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন মমতা। সাম্প্রতিক কালে এনআরসি থেকে শুরু করে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার, সবকিছু নিয়েই দিল্লিতে এবং রাজ্যে সরব হয়েছে তৃণমূল। এই অবস্থায় অযোধ্যা রায়ের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তৃণমূলের এই নিস্তব্ধতা, আমজনতাকেও অবাক করেছে।