প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুকুল রায় রবিবার কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১।

প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুকুল রায় রবিবার কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং পরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন বিশিষ্ট নেতা, মুকুল রায় গত দুই দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দৃশ্যপট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পশ্চিমবঙ্গে একজন বিরোধী নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিলেন, তখন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন মুকুল। ১৯৯৮ সালে মমতা এবং অন্যদের সঙ্গে কংগ্রেস ত্যাগ করে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন মুকুল। তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনের মধ্যে দ্রুত উত্থান লাভ করেন মুকুল এবং ২০০৬ সালে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। দলের তৃণমূলস্তরে নেটওয়ার্ক গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এর অন্যতম প্রধান সাংগঠনিক কৌশলবিদ হিসেবে বিবেচিত হন।

তৃণমূল কংগ্রেসের ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়।

জন্ম ও লেখাপড়া

১৯৫৪ সালের ১৭ এপ্রিল জন্ম গ্রহণ করেন মুকুল রায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসির ডিগ্রি, তারপর ২০০৬ সালে পাব্লিক অ্যাডমিনিসট্রেশন নিয়ে মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেন মুকুল রায়।

জাতীয় পর্যায়ে মুকুল রায় কী ভূমিকা পালন করেছিলেন?

মুকুল রায় ২০০৬ সালে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। ইউপিএ ২ সরকারের আমলে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদে যোগ দেন। তিনি প্রথমে জাহাজ চলাচল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ২০১২ সালের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

কেন মুকুল রায় তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন এবং আবার ফিরে আসেন?

সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি এবং নারদ স্টিং অপারেশন সম্পর্কিত তদন্তে তাঁর নাম উঠে আসার পর তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে মুকুলের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ২০১৫ সালে তাঁকে দলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং অবশেষে ২০১৭ সালে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। বিজেপি তাঁকে জাতীয় সহ-সভাপতি পদে নিযুক্ত করে। তৃণমূলের মতো বিজেপির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মুকুল।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয়লাভ করে বিজেপির পারফরম্যান্স রাজ্যের রাজনীতিতে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর থেকে বিজেপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। তবে, ২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে আসেন। তবে বিধায়কপদ থেকে ইস্তফা দেননি। ফলে তৃণমূলে যোগ দিলেও মুকুল খাতায়কলমে বিজেপি বিধায়ক হয়েই থেকে গিয়েছিলেন। এমনকি, তাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) চেয়ারম্যানও করা হয়েছিল। সাধারণত, ওই পদে বিরোধী দলের সদস্যকে বসানো হয়।

তাঁর এই পরিবর্তনের ফলে দলত্যাগ বিরোধী আইনের অধীনে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁর বিধায়ক পদ খারিজের দাবি জানান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপি বিধায়ক অম্বিকা রায়। বিধানসভার স্পিকার মুকুল রায়ের পদ খারিজ করতে অস্বীকার করায় মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। ২০২৫ সালে হাইকোর্ট মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজের নির্দেশ দেয়। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যানের পদ বাতিল করা হয়। কিন্তু পরে সুপ্রিম কোর্ট আদেশে স্থগিতাদেশ দেয়।