সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়লে, সেখান থেকে কোনো রোগীকে এই বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে পাঠানো হলে তারা রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। সরকারি রেফারেলের মাধ্যমে আসা এই রোগীদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করতে হবে?
এ রাজ্যে এবার পুরোদমে কার্যকর হতে চলেছে 'জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন' (NHM) এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ফ্ল্যাগশিপ স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প 'আয়ুষ্মান ভারত যোজনা'। শনিবার কলকাতায় স্বাস্থ্য দপ্তরের একটি অনুষ্ঠানে এই কথা ঘোষণা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এ রাজ্যের ১ কোটি ৩৬ লক্ষেরও বেশি পরিবারকে এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হবে, যার ফলে এক বিশাল অংশের মানুষ ক্যাশলেস ও গুণগত স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা পাবেন।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এ রাজ্যের জন্য মোট ২,১০৩ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রথম কিস্তির ৫২৭ কোটি টাকা রাজ্য সরকারের হাতে এসে পৌঁছেছে। এই অর্থ দিয়ে গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিকাঠামো আমূল বদলে ফেলা সম্ভব হবে।
১.৩৬ কোটি পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকার রক্ষাকবচ
মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর স্পষ্ট যে, রাজ্যের বাসিন্দারা এবার থেকে সরকারি ও তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালে প্রতি বছর পরিবার পিছু সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিখরচায় চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। দেশের অন্যান্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকেরাও এই সুবিধার বাইরে থাকবেন না।
এ দিনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও একটি বড় ঘোষণা করেন। তিনি জানান, রাজ্যের সমস্ত সরকারি হাসপাতালগুলি এবার থেকে ‘আয়ুষ্মান মন্দির’ নামে পরিচিত হবে। ওষুধের দামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "যদি কোনো সাধারণ মানুষের বাইরে ওষুধের পেছনে মাসে ১,০০০ টাকা খরচ হয়, তবে 'আয়ুষ্মান মন্দির' বা এই হাসপাতালগুলি থেকে সেই একই ওষুধ মাত্র ১০০ টাকায় পাওয়া যাবে।"
জেলায় জেলায় নতুন মেডিকেল কলেজ
রাজ্যের সব প্রান্তের মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে পরিকাঠামো উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং পশ্চিম বর্ধমান— এই চার জেলায় নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে। তাঁর কথায়, "রাজ্যের কোনো জেলাই যেন মেডিকেল কলেজের মতো বড় ও জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত না থাকে।" এর পাশাপাশি চিকিৎসার খরচ আরও কমাতে রাজ্যজুড়ে ৪৬৭টি 'প্রধানমন্ত্রী জনৌষধি কেন্দ্র' চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই ক্যানসারের মতো মারণ রোগের ওষুধেও প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভরতুকি (সাবসিডি) মিলবে বলে জানান তিনি।
রেফার রোগ ও দালালি রুখতে কঠোর বার্তা
হাসপাতালে 'রেফার রোগ' এবং দালাল চক্র রুখতে রাজ্য সরকার যে 'জিরো টলারেন্স' নীতি নিয়ে চলছে, তা এ দিন কড়া ভাষায় মনে করিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতা মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীকে বিনা কারণে রেফার করার অভিযোগে ইতিমধ্যেই কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
হাসপাতালগুলির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য 'স্বাস্থ্য ভবন'-এ একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম) গড়ে তোলা হচ্ছে। এই কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলির পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের পরিষেবা এবং প্রশাসনিক কাজকর্মের লাইভ মনিটরিং করা হবে।
যে সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলি সরকারের কাছ থেকে মাত্র ১ টাকার নামমাত্র মূল্যে বা লিজের শর্তে জমি পেয়েছিল, তাদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালকে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ও দরিদ্র রোগীদের জন্য ১৫ শতাংশ শয্যা (Beds) সংরক্ষিত রাখতে হবে।
সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়লে, সেখান থেকে কোনো রোগীকে এই বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে পাঠানো হলে তারা রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। সরকারি রেফারেলের মাধ্যমে আসা এই রোগীদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করতে হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন ও আয়ুষ্মান ভারতের মতো প্রকল্পগুলিকে রাজ্যে বাস্তবায়িত করার এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা ব্যবস্থার রূপরেখা বদলে দিতে এক অত্যন্ত কার্যকরী পদক্ষেপ হতে চলেছে।
