আশিস মণ্ডল, রামপুরহাট: রাজনীতি বা অন্য কোনও কারণ নয়। বরং সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের জেরেই মেয়ে, জামাই এবং নাতিকে খুন হতে হয়েছে বলে দাবি করলেন মুর্শিদাবাদে নিহত স্কুল শিক্ষক  বন্ধুপ্রকাশ পালের শাশুড়ি চন্দনা মণ্ডল। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিহত স্কুল শিক্ষকের এক বন্ধুও যুক্ত থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন চন্দনাদেবী। 

বন্ধুপ্রকাশ পাল নামে জিয়াগঞ্জের ওই স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী বিউটি পাল এবং ৬ বছরের ছেলে বন্ধুঅঙ্গন পালও দশমীর দিন নিজেদের বাড়িতেই খুন হয়। নিহত বিউটিদেবীর বাপের বাড়ি বীরভূমের রামপুরহাট থানার সিউড়ার নাইশোর গ্রামে। মেয়ে, জামাই, নাতিকে হারিয়ে মণ্ডল বাড়িতে এখন শোকের ছায়া। তার মধ্যেই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন বিউটিদেবীর মা চন্দনা মণ্ডল। 

আরও পড়ুন- বেহুঁশ করে প্রবল আক্রোশে হত্যা, নেপথ্যে পরিচিতই, মুর্শিদাবাদে নিশ্চিত পুলিশ

আরও পড়ুন- মুর্শিদাবাদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরব অপর্ণা, রাজধর্ম মনে করালেন মুখ্যমন্ত্রীকে

চারদিন কেটে গেলেও জিয়াগঞ্জ হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ফলে সিবিআই তদন্তের দাবি করে বিউটিদেবীর মা চন্দনাদেবীর অবশ্য দাবি, দাম্পত্য জীবনে মেয়ে জামাইয়ের মধ্যে কোনও অশান্তি না থাকলেও ননদের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ ছিল নিহত স্কুল শিক্ষকের। চন্দনাদেবীর আরও দাবি, সৌভিক বণিক ওরফে দীপ নামে নিজের এক বন্ধুকে ব্যবসা করার জন্য কয়েক লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে জোগাড় করে দিয়েছিলেন বন্ধুপ্রকাশবাবু। কিন্তু সেই টাকা ফেরত পাননি তিনি। তা নিয়েও বন্ধুর সঙ্গে গন্ডগোল চলছিল ওই স্কুল শিক্ষকের।  এ নিয়েও বন্ধুপ্রকাশবাবুর সঙ্গে তাঁর বন্ধুর অশান্তি চলছিল। 

বিউটিদেবীর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, আট বছর আগে ওই তরুণীর সঙ্গে বন্ধুপ্রকাশ পালের বিয়ে হয়। নিহত স্কুল শিক্ষকের বাড়িও আগে বীরভূমের নাইশোর গ্রামে ছিল। কিন্তু তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় বন্ধুপ্রকাশের মা দুই মেয়ে ওএক ছেলেকে নিয়ে মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি থানার বাড়ালা গ্রামে থাকতে শুরু করেন। বছর দু' য়েক আগে জিয়াগঞ্জে বাড়ি করে স্ত্রী এবং ছেলেকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন বন্ধুপ্রকাশবাবু। তাঁর স্ত্রী বিউটিদেবী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। 

বিউটিদেবীর বাবা সুখেন মণ্ডল বলেন, “জামাইদের কয়েক বিঘে জমি রয়েছে। এ ছাড়া জিয়াগঞ্জের বাড়িটি ছিল জামাই ও শাশুড়ির নামে। এ নিয়েও ননদ ও তাঁদের স্বামীরা অশান্তি করতেন। তারা মেয়েকে সপরিবারে খুনেরও হুমকি দিয়েছিল। তাছাড়া জামাইয়ের এক বন্ধু শৌভিক বণিক  এই খুনের পিছনে হাত থাকতে পারে। কারণ শৌভিক ব্যবসা করবে বলে তাঁকে ঋণ নিয়ে ছয়- সাত লক্ষ টাকা জোগাড় করে দিয়েছিল আমার জামাই।  সেই টাকা পরিশোধ করতে না পারায় সুদের টাকা আমাকে পরিশোধ
করতে হয়েছে। এ নিয়ে ঝামেলা করতে দিতাম না। দেখলাম টাকা যাচ্ছে যাক, জীবনটা তো বাঁচুক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের বাঁচাতে পারলাম না।'

চন্দনাদেবী আরও অভিযোগ করে বলেন, 'দশমীর দিন সকালে মেয়ের সঙ্গে কথা হয়। ঠিক ছিল একাদশীর দিন তাঁরা সিউড়া গ্রামে আসবে। তার পরেই দুঃসংবাদ পেলাম।' চন্দনাদেবীর আরও অভিযোগ, 'সম্পত্তির জন্যই ওদের খুন করা হয়েছে। নিজের
লোক না থাকলে এভাবে খুন করা যেত না। দুই ননদ ও শাশুড়ি মেয়ের উপরে অত্যাচার করত। সম্পত্তি নিয়ে অশান্তি হতো। অশান্তির হাত থেকে বাঁচতে এবং ছেলের পড়াশোনার জন্যই জামাই জিয়াগঞ্জে জায়গা কিনে বাড়ি করে থাকতে শুরু করে। সেই জায়গা নিয়েও অশান্তি করত। শাশুড়ি শুধু দুই মেয়েকেই ভালবাসত। ছেলেকে খুব ভালবাসতে না। ফলে আমার মেয়েকেও দেখতে পারত না।'

শুক্রবার বিকেলেই ঘটনার তদন্তে রামপুরহাট পুরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্যাস অফিস গলিতে শৌভিক বণিক নামে নিহত স্কুল শিক্ষকের বন্ধুর বাড়িতে আসে মুর্শিদাবাদের লালবাগ মহকুমার পুলিশ আধিকারিক বরুণ বৈদ্য। তিনি এসে শৌভিকের ঘর থেকে কিছু কাগজপত্র নিয়ে যান। শৌভিকের দাদা সৌরভ বণিক বলেন, 'পুলিশ এসে কিছু কাগজপত্র নিয়ে গিয়েছে। মাস ছয়েক ধরে ভাইয়ের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। ফলে ভাই কোথায় আছে বলতে পারব না। পুলিশকেও তাই জানিয়েছি।'