রমজান মাসের ত্রিশটা দিন কঠোর সংযম পালন। আর তারপর পূব আকাশে একফালি চাঁদ দেখা দিলেই মুর্শিদাবাদের নবাবনগরীতে শুরু হয়ে যায় ইদের খুশি। নতুন জামা-কাপড়, সুরমা, আতর, গোলাপ, পোলাও, বিরিয়ানি, হালিম, ফিরনি, হালুয়া ,সেমাই, লাচ্চা-র সুবাসে ভয়ে যায় লালবাগ। বস্তুত ইদের দিনকয়েক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় খুশির কাউন্টডাউন। কিন্তু, এবার করোনার গ্রাসে সেই উজ্জ্বল উৎসবের ছবিটা একেবারে ম্লান।

মুর্শিদাবাদের লালবাগে অবস্থিত নিজামাত ইমামবাড়া হল এশিয়ার বৃহত্তম ইমামবাড়া। ১৮৪৭ সালে নবাব মনসুর আলি খান এই ইমামবাড়াটি তৈরি করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক ইমামবাড়াটি জুড়ে ইদের দিন থিক-থিক করে মানুষের ভিড়। এবার পুরো এলাকাটা খা খা করছে। নেই গোলাপ-আতরের গন্ধ। নেই নতুন জামাকাপড় পরা বাচ্চা থেকে বুড়োর দল। বিশাল সফেদ ইমারতটা যেন জিনপরিদের আড্ডাখানা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে ইদ মানে ভিনরাজ্য থেকে জেলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার সময়ও বটে। সারা বছরের রোজগার থেকে বাড়িতে অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্য মস্ত বড় ব্যাগ ভর্তি করে নতুন জামাকাপড় উপহার সামগ্রী নিয়ে ফেরেন তাঁরা। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন বাড়ির ছোট থেকে বড় সকলেই। এবারেও পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরছেন। কিন্তু তিরকালের চেনা সেই ছবিটা একেবারে পাল্টে গিয়েছে।

গত দুইমাস ধরে কোনও রোজগার নেই। ভিনরাজ্যে টিকে থাকতে গিয়ে হাত একেবারে ফাঁকা। তাই কাঁধে নেই উপহার ভরা বড় ব্যাগ। বদলে রয়েছে হাসপাতালের দেওয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত চির কূট। ইদের আনন্দ দূরে থাক, সামনের দিনগুলোয় কীভাবে খেয়ে-পরে বাঁচবেন, সেই চিন্তা গ্রাস করছে তাঁদের। পূব আকাশের চাঁদের ফালিকে নিয়েও তাই বিন্দুমাত্র উন্মাদনা নেই মানুষের মধ্যে। ঘরে ঘরে হয়নি হালুয়া, সেমাই, পোলাও।

করোনাভাইরাস পরবর্তী পৃথিবীর স্বাস্থ্য বিধি মেনে কোনও ইদগা বা মসজিদে জমায়েত করেননি কেউ। তাই ইদের খুশিতে ময়দান কিংবা মসজিদের সাজ সজ্জাতেও মনোযোগ নেই কারোর।

তবে বাস্তব পরিস্থিতিটা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায়ও নেই বলেই জানিয়েছেন মুর্শিদাবাদের ছোটে নবাব, অর্থাৎ রেজা আলি মির্জা। ইদের দিন নবাব পরিবারের এই সদস্য জানিয়েছেন, 'করোনা শুধু ইদের খুশি থেকে মানুষকে বঞ্চিত করেছে তা তো নয়, মানুষের পুরো জীবনযাত্রাই পাল্টে দিয়েছে এই মহামারি। অর্থনীতিতেও এর ব্যাপক প্রভাব দেখা দিয়েছে। ফলে ইদ নিয়ে আলাদা করে আফসোস করার কিছু নেই।'