কলেজ জীবনের প্রেমিক- প্রেমিকার ফের যোগাযোগ হয়েছিল ফেসবুকে। বিবাহিত প্রেমিকার স্বামী ছিলেন দু' জনের নতুন জীবন শুরু করার পথে অন্তরায়। তাই প্রেমিকের সঙ্গে মিলে নিজের স্বামীকে খুন করার ছক কষেছিল স্ত্রী। পুরুলিয়ায় অধ্যাপকের খুনের ঘটনায় পুলিশি তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এলো। নিহত অধ্যাপকের স্ত্রী এবং তার প্রেমিককে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। 

গত ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে নিজের বাড়িতেই খুন হন পঞ্চাশোর্ধ অরূপ কুমার চট্টরাজ। অরূপ বাবু স্থানীয় নিস্তারিনি কলেজের আংশিক সময়ের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী পাঁপড়ি চট্টরাজ শহরের একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তদন্তে নেমে প্রথম থেকেই এই খুনে পুলিশ  অরূপ বাবুর স্ত্রী পাপড়িকে সন্দেহের  তালিকায় রেখেছিল। পাপড়ির প্রেমিক রাঁচি থেকে ধরা পড়ে যেতেই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে অসুবিধে হয়নি পুলিশের। 

ওই অধ্যাপক খুন হওয়ার পর তাঁর মা লীলা চট্টরাজ পুলিশের কাছে খুনের অভিযোগ দায়ের করলেও তাতে কারও নাম ছিল না। কিন্তু পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নিহতের স্ত্রীকেই সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল পুলিশ। তদন্তে নেমে গত ২৪ জানুয়ারি রাঁচি থেকে পাপড়ির প্রেমিক অজয় আম্বাউনিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাকে জেরা করেই উঠে আসে পাপড়ির নাম। এর পর পুলিশি জেরায় ভেঙে পড়ে গোটা ঘটনার কথা স্বীকার করে পাপড়ি। শনিবার রাতেই তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ দিন আদালতে তোলা হলে দু' জনকেই ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। 

তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে ইদানীং স্ত্রী পাপড়ির সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক ছিল না নিহত অধ্যাপক অরূপ চট্টোরাজের দু' জনে আলাদা ঘরে ঘুমোতেন। বিভিন্ন সূত্রে তদন্তকারীরা অজয় আম্বাউনির কথা জানতে পারেন। পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় কুড়ি বছর আগে পুরুলিয়া জে কে কলেজে একই সাথে পড়তো পাঁপড়ি এবং অজয়। অজয় আম্বাউনির আদি বাড়ি মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে। পড়াশোনা শেষ হলে পরিবারের সঙ্গে সেখানেই চলে যায় অজয়। এর পর আর দু' জনের সম্পর্ক ছিল না। 

অভিযুক্ত পাপড়ি চট্টরাজের বাড়ি পুরুলিয়া শহরের আমলাপাড়া এলাকায়। অরূপ চট্টরাজ সেই সময় পাপড়ির গৃহশিক্ষক ছিলেন। সেই সূত্রেই অরূপবাবুর সঙ্গেও পাপড়ির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলে ২০০৯ সাল নাগাদ দু' জনের বিয়ে হয়ে যায়। তাঁদের একটি দশ বছরের মেয়েও রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, প্রায় আড়াই বছর আগে ফেসবুকের মাধ্যমে পাপড়ির সঙ্গে তার পুরনো প্রেমিক অজয়ের যোগাযোগ হয়। ফের দু' জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। জব্বলপুরে পরিবার রেখেই পাপড়ির সঙ্গে দেখা করতে পুরুলিয়া চলে আসে অজয়। শহরের রাঁচি রোডে একটি ঘরে ভাড়া নিয়ে স্বামী- স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মাঝেমধ্যেই দেখা করত দু' জনে। সেই বাড়িতে বসেই গত ১৭ তারিখ অরূপবাবুকে খুনের ছক কষে প্রেমিক- প্রেমিকা। 

আরও পড়ুন- ঘরে ঢুকতেই হামলা, মায়ের সামনে 'খুন' অধ্য়াপক ছেলে

তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, প্রতিদিন সন্ধেবেলা ক্যারম খেলতে বেরোতেন অরূপবাবু। সেই সুযোগেই প্রেমিক অজয়কে বাড়িতে ঢোকানোর ব্যবস্থা করে পাপড়ি। দোতলার ঘরে লুকিয়ে ছিল সে। এর পর অরূপবাবু ফিরতেই আচমকা তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অজয়। মাফলার দিয়ে শ্বাসরোধ করে অরূপবাবুকে খুন করে সে। আওয়াজ পেয়ে অরূপবাবুর মা লীলাদেবী ছেলেকে বাঁচাতে গেলে তাঁকে ধাক্কা মেরে পালায় অজয়। পরে ওই বৃদ্ধার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে অরূপবাবুর মৃতদেহ দেখতে পান। 

ঘটনার পর থেকেই অরূপবাবুর স্ত্রীর আচরণে সন্দেহ জেগেছিল তদন্তকারীদের মনে। তাঁর অসংলগ্ন কথাবার্তায় সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়। শেষ পর্যন্ত ঘটনার দশ দিনের মধ্যেই খুনের কিনারা করে ফেলল পুরুলিয়া জেলা পুলিশ।