
ভারতে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করেন। সস্তায় দূরপাল্লার যাত্রার জন্য সাধারণ মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত—সবাই রেলের ওপর নির্ভরশীল।
যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার সময় তাঁদের পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এবার বড় নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।
এতদিন শুধু অনলাইনে টিকিট কাটলেই বিমার সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু এবার স্টেশনের কাউন্টার থেকে টিকিট কাটলেও এই সুবিধা দিতে হবে। আদালত এই নির্দেশই দিয়েছে।
আদালত জানিয়েছে, স্টেশনের কাউন্টার থেকে টিকিট কাটা আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া যাত্রীরা যাতে বিমার সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে রেলকে যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাই সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে কাউন্টারে কাটা সব টিকিটেও অনলাইনের মতো বিমা কভারেজ দিতে হবে।
এই নির্দেশ কার্যকর করতে ব্যর্থ হলে সরাসরি রেলওয়ে বোর্ডকে দায়ী করা হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
এই নির্দেশ কার্যকর হলে, যাঁরা অনলাইনে টিকিট কাটতে পারেন না, তাঁরাও এবার বিমার আওতায় আসবেন।
বর্তমানে IRCTC-র ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে টিকিট কাটার সময় যাত্রীরা চাইলে বিমা নিতে পারেন।
২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কর-সহ এই বিমার প্রিমিয়াম যাত্রীপ্রতি মাত্র ৪৫ পয়সা।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী বিমার কভারেজগুলো হলো:
বিমার ধরন - কভারেজের পরিমাণ
যাত্রাপথে দুর্ঘটনায় মৃত্যু - ১০,০০,০০০ টাকা
সম্পূর্ণ স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা - ১০,০০,০০০ টাকা
আংশিক স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা - ৭,৫০,০০০ টাকা
আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ - ২,০০,০০০ টাকা
মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার খরচ - ১০,০০০ টাকা
জরুরি বিষয়: এগুলো বর্তমান বিমা পলিসির কভারেজ। প্রতিটি ক্ষতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত মেনেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। ২৭ অক্টোবর থেকে কাউন্টারের টিকিটে এই নিয়ম কীভাবে কার্যকর হবে, তা রেলওয়ে বোর্ডের ওপর নির্ভর করছে।
এতদিন শুধু অনলাইনে টিকিট কাটার সময়ই ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স বা ভ্রমণ বিমা বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এবার স্টেশনের কাউন্টারেও এই সুবিধা দিতে হবে।
এর ফলে যাঁরা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন না বা আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষ, তাঁরা সরাসরি টিকিট কাটলেও সুরক্ষিত থাকবেন।
তবে কাউন্টারে টিকিট কাটার সময় বিমার প্রিমিয়াম কীভাবে নেওয়া হবে বা পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে চলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ভারতে ট্রেন যাত্রা অনেকের জন্যই অপরিহার্য। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা যাত্রীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারকেও চরম আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে সামান্য প্রিমিয়ামের বিনিময়ে পাওয়া ভ্রমণ বিমা বড়সড় আর্থিক সহায়তা দিতে পারে।
পলিসিবাজারের ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স বিভাগের বিজনেস হেড মানস কাপুর জানিয়েছেন, সব যাত্রীর জন্য বিমা কভারেজ সম্প্রসারণের এই সিদ্ধান্ত সত্যিই প্রশংসনীয়। একে শুধু একটি অপশন হিসেবে না দেখে, যাত্রীদের আর্থিক সুরক্ষার ঢাল হিসেবে দেখা উচিত।
তিনি আরও বলেন, সস্তা যাতায়াতের জন্য যাঁরা ট্রেনের ওপর নির্ভরশীল, দুর্ঘটনার সময় এই বিমা তাঁদের পরিবারকে বড় আর্থিক সাহায্য জোগাবে।
• কবে থেকে চালু: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬।
• কাদের জন্য: স্টেশনের কাউন্টার থেকে টিকিট কাটা যাত্রীদের জন্য।
• বর্তমান অনলাইন প্রিমিয়াম: যাত্রীপ্রতি ৪৫ পয়সা (কর-সহ)।
• সর্বোচ্চ কভারেজ: মৃত্যু বা সম্পূর্ণ অক্ষমতায় ১০ লাখ টাকা।
• ব্যর্থ হলে দায়ী কে: রেলওয়ে বোর্ডকে সরাসরি দায়ী করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
• মাথায় রাখবেন: কাউন্টারে বিমা পাওয়ার নিয়ম এবং প্রিমিয়ামের বিষয়ে রেলের সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নজর রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে, আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে স্টেশনের কাউন্টারে কাটা টিকিটেও ভ্রমণ বিমা দেওয়ার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর ফলে সরাসরি টিকিট কাটা যাত্রীরাও বিমার আওতায় আসবেন। বিস্তারিত নিয়মকানুন সামনে এলে পুরো বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, কাউন্টারে বিক্রি হওয়া টিকিটেও বিমা কভারেজ দিতে হবে। কিন্তু যাত্রীদের থেকে জোর করে বিমার টাকা নেওয়া হবে, নাকি অনলাইনের মতো অপশন থাকবে—সে বিষয়ে বিস্তারিত নিয়মকানুন এখনও জানা যায়নি। তাই সব যাত্রীর জন্য বিমা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে, এমনটা ভাবার আগে রেলওয়ে বোর্ডের সরকারি বিজ্ঞপ্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
২০২৩ সালের জুনে ওড়িশার ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর দায়ের হওয়া একটি মামলার প্রেক্ষিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি আহসানউদ্দিন আমানুল্লাহ এবং আর. মহাদেবনের বেঞ্চ গত ৬ অক্টোবর এই নির্দেশ দেয়।
আবেদনে বলা হয়েছিল, 'কবচ' (Kavach) সিস্টেম না থাকাই ওড়িশা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তাই সারা দেশে রেললাইনে এই সিস্টেম চালুর দাবি জানানো হয়।
মামলার শুনানির সময়, স্টেশনের কাউন্টার থেকে টিকিট কাটা যাত্রীদের বিমা দেওয়ার প্রক্রিয়া তৈরির জন্য রেলওয়ে আধিকারিকদের আগেই সময় দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু চলতি মাসের ৬ অক্টোবরের শুনানিতে আদালত দেখে, এই বিষয়ে কোনও কাজই এগোয়নি। এরপরই স্টেশনের কাউন্টারে বিক্রি হওয়া সব টিকিটে বিমা কভারেজ দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত।