
India-Bangladesh Business: চার বছর পর ফের ভারত থেকে গম আমদানি করছে বাংলাদেশ। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই ভারত থেকে ২ লক্ষ টনেরও বেশি গম আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রতি টন গমের দাম পড়ছে প্রায় ৩০৬ থেকে ৩২৬ মার্কিন ডলার। রেলপথে ভারত থেকে বাংলাদেশে পৌঁছবে গম। ২০২২ সালের পর এই প্রথম এত বড় পরিমাণে ভারতীয় গম কিনছে বাংলাদেশ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে (Russia-Ukraine war) কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে গম সরবরাহে ফের ব্যাঘাত ঘটেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে চালের দাম পৌঁছেছে সর্বকালীন উচ্চতায়। ফলে গমের চাহিদা বেড়েছে এবং গত এক মাসে দেশে আটার দাম বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে চার বছর পর ফের ভারত থেকে গম আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। বিরিয়ানি-পোলাওয়ের মতো খাবারও চাল থেকেই তৈরি হয়। কিন্তু এখন চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ভাত ছেড়ে রুটি-পরোটা খাওয়া শুরু করেছেন। বাংলাদেশে চালের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত শস্য গম। ঢাকার সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টার-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১০ লক্ষ টন গম উৎপাদন করে। কিন্তু দেশের চাহিদা মেটাতে আরও প্রায় ৭০ লক্ষ টন গম আমদানি করতে হয়। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে গমের অন্যতম বড় সরবরাহকারী ভারত। কোনও কোনও বছরে বাংলাদেশের মোট গম আমদানির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে ভারত থেকে। দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে ভারত বাংলাদেশে ১১,৫৭,৩৯৯.৩৫ টন গম রফতানি করেছিল। যার মূল্য ছিল প্রায় ২৯৯.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০২২ সালে সেই বাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগে। ভারত গম রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ জারি করায় বাংলাদেশকে বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হয়।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করলে বিশ্ব গমের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। রাশিয়া ও ইউক্রেন, দুই দেশই বিশ্বের অন্যতম প্রধান গম রফতানিকারী। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে গমের চাহিদা ও দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। সেই সময় ভারতও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০২১-২২ ফসল বছরে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ভারতের গম উৎপাদন আগের বছরের ১০৯.৫৯ মিলিয়ন টন থেকে ২.৫ শতাংশ কমে ১০৬.৮৪ মিলিয়ন টনে নেমে যায়। কম ফলন, বিশ্ববাজারে বাড়তি চাহিদা এবং দেশের বাজারে গমের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার পর ২০২২ সালে গম রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে নয়াদিল্লি। আগে জারি হওয়া লেটার অব ক্রেডিটের ভিত্তিতে কিছু চালান এবং অন্য দেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রয়োজন মেটাতে অনুমোদিত কিছু রফতানি অবশ্য এর আওতায় পড়েনি। ভারতীয় গমের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনা, কানাডা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মতো দেশ থেকে গম আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছিল কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে।
চার বছর পর চলতি বছরের আগস্টে ভারত ফের গম রফতানির অনুমতি দেয়। ২০২৫-২৬ ফসল বছরে ভারতে রেকর্ড ১২০.৬৫ মিলিয়ন টন গম উৎপাদন হয়েছে। বিপুল উৎপাদনের ফলে দেশের বাজারে উদ্বৃত্ত তৈরি হয় এবং গমচাষিদের আয়েও চাপ পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে রফতানির দরজা ফের খুলে দেয় ভারত। ঠিক সেই সময়েই কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সরবরাহ সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলতি সংঘাতের জেরে কৃষ্ণসাগরে জাহাজ এবং শস্য টার্মিনালগুলিতে হামলার ঘটনা সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের গম রফতানি এপ্রিলের ৪৮ লক্ষ টন থেকে আগস্টে কমে প্রায় ১১.৩ লক্ষ টনে নেমেছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো কৃষ্ণসাগরীয় গমের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলির জন্য সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার, মার্কিন কৃষি দফতরের (USDA) পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের গম আমদানি ৬৭ লক্ষ টনে পৌঁছতে পারে। আগের বছরের তুলনায় যা প্রায় ৭.৫ শতাংশ বেশি। দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চালের দাম এবং তার জেরে গমের বাড়তে থাকা চাহিদাকেই এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এ বছরের জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, মে মাসের বার্ষিক ধান কাটার মাত্র দু’মাস পরেই বাংলাদেশে সব ধরনের চালের গড় দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো দেশ থেকে বিকল্প গম সংগ্রহ করতে পারলেও সেগুলির দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে অস্ট্রেলিয়ার গম প্রতি টনে ৩৮০ মার্কিন ডলারের কম দামে পাওয়া গেলেও, এখন বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের প্রায় ৪৮০ মার্কিন ডলার দিতে হচ্ছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর সিনিয়র ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার তসলিম শাহরিয়ারের উদ্ধৃতি দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে ব্লুমবার্গ। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও। ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় পরিশোধিত গমের আটার দাম গত এক মাসে প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
এই জায়গাতেই ভারতের গম বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে পরিবহণের সময় কম এবং মালবাহী খরচও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে দূরের দেশ থেকে গম আমদানির তুলনায় ভারতীয় গম বেশি সাশ্রয়ী হয়ে উঠছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশী আমদানিকারকরা ভারতীয় গম প্রতি টন প্রায় ৩০৫ থেকে ৩২৬ ডলারে কিনতে পারছেন। এ বছরের অগাস্টে ভারত রফতানির অনুমতি দেওয়ার পর বাংলাদেশী ক্রেতারা অন্তত দুই লক্ষ টন গম বুক করেছেন। ভারতীয় গমের দিকে শুধু বাংলাদেশই ফিরছে না। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কার আমদানিকারকরাও সম্প্রতি ভারত থেকে প্রায় ৬০ হাজার টন গম কিনেছেন। শিপিং খরচের আগে প্রতি টনের দাম ছিল প্রায় ৩২৫ ডলার। USDA-র ফরেন অ্যাগ্রিকালচারাল সার্ভিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে রফতানি ব্যাহত হওয়ার কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের গম রফতানি চার গুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ২০ লক্ষ টনে পৌঁছতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশও ভারত থেকে গম কেনার সম্ভাব্য ক্রেতাদের তালিকায় রয়েছে। ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সঙ্কট এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্যের দামের চাপ, দুইয়ের মাঝেই চার বছর পর ভারতীয় গম ফের বাংলাদেশের বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।