Prafulla Chandra Chaki: অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী। তিনি ১৯০৮ সালে মাত্র ১৯ বছর ৫ মাস বয়সে ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে প্রাণ হারান। বাংলাদেশের (Bangladesh) বগুড়া জেলার বিহার গ্রামে এই বিপ্লবীর জন্মভিটে এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। পরিবার চাইছে, প্রফুল্ল চাকীর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হোক।
KNOW
Prafulla Chandra Chaki News: বাংলাদেশের (Bangladesh) বগুড়া জেলার বিহার গ্রামের পোদ্দার পাড়া অঞ্চলে বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকীর জন্মভিটে অধিগ্রহণ করুক বাংলাদেশ সরকার। এই জমিতে কোনও দাতব্য চিকিৎসালয়, পাঠাগার, বিদ্যালয়, সংগ্রহশালার মতো জনস্বার্থমূলক কোনও কেন্দ্র গড়ে তোলা হোক। এমনই আর্জি জানাল এই বিপ্লবীর পরিবার। মঙ্গলবার কলকাতার পার্ক সার্কাসে বাংলাদেশ উপ দূতাবাসে যান প্রফুল্ল চাকীর বড়দা প্রতাপ চাকীর প্রপৌত্র সুব্রত চাকী ও তাঁর স্ত্রী তন্দ্রা চাকী। তাঁরা কলকাতায় বাংলাদেশের উপ রাষ্ট্রদূত মহম্মদ খালেদের সঙ্গে দেখা করেন। সুব্রতবাবু জানিয়েছেন, সদর্থক আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ উপ রাষ্ট্রদূত তাঁদের কথা মন দিয়ে শুনেছেন। তাঁরা আশাবাদী, বাংলাদেশ সরকার এই আবেদনে সাড়া দেবে।
পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে প্রফুল্ল চাকীর জন্মভিটে
এশিয়ানেট নিউজ বাংলার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সুব্রতবাবু বলেছেন, ‘আমি কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) চিঠি দিয়েছিলাম। আমার আর্জি ছিল, রংপুর জেলা স্কুলের অন্যতম কৃতী ছাত্র প্রফুল্ল চাকীর স্মৃতি সংরক্ষণ করার জন্য তাঁর নামে স্কুলের কোনও এক কক্ষের নামকরণ করা হোক। কিন্তু সেই সময় আমি বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে সাড়া পাইনি। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে আমার কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি আমার পূর্বপুরুষের ভিটের ছবি পাঠিয়েছেন। কয়েক বছর আগে সেখানে প্রফুল্ল চাকীর মূর্তি ও ফলক স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেসব নেই। মূর্তি উধাও হয়ে গিয়েছে। ফলক প্রায় পড়া যায় না। আমাদের পূর্বপুরুষের মোট জমি ছিল প্রায় এক বিঘে। সেই জমির কিছুটা নদীর গ্রাসে চলে গিয়েছে। বাড়ি ভেঙে মাটিতে মিশে গিয়েছে। জমি দেখে এখন বোঝাই যায় না যে সেখানে বাড়ি ছিল। পুরো জায়গা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। এই ছবি দেখে আমি সিদ্ধান্ত নিই, বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করব, তাঁরা যদি জমি অধিগ্রহণ করে প্রফুল্ল চাকীর স্মৃতিরক্ষা করার জন্য কিছু একটা করেন, তাহলে আমি শান্তি পাব। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ উপ দূতাবাসে চিঠি দিই। তারপর আমাকে ফোন করে আজ দেখা করতে বলা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী আজ উপ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করলাম। উনি ভালোভাবে কথা বলেছেন, আমাদের কথা শুনেছেন। আমার কাছে যা তথ্য ও নথি আছে, সেসব দিয়েছি। বলেছি, প্রয়োজনে আরও তথ্য দেব। বাংলাদেশের উপ রাষ্ট্রদূত আর একবার বিস্তারিত তথ্য দিয়ে চিঠি দিতে বলেছেন। সেই চিঠি দেব। আশা করি বাংলাদেশ সরকার আমাদের আবেদনে সাড়া দেবে।’ সুব্রতবাবু আরও বলেছেন, 'বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমার আর একটা অনুরোধ থাকবে, যদি বগুড়া জেলায় আমার পূর্বপুরুষের বাড়ির সামনে অথবা রংপুর জেলা স্কুলে যাওয়ার রাস্তায় প্রফুল্ল চাকীর নামে রাস্তার নামকরণ করা যায়, তাহলে আরও মানুষ এই বিপ্লবী সম্পর্কে জানতে পারবে।'
জন্মভিটে দর্শনের ইচ্ছা প্রফুল্ল চাকীর উত্তরসূরির
সুব্রতবাবু আরও বলেছেন, ‘আমি কোনওদিন বাংলাদেশে যাইনি। ১৯৫২-৫৩ সাল পর্যন্ত পূর্বপুরুষের ভিটেয় পরিবারের কয়েকজন সদস্য ছিলেন। তারপর তাঁরা পাকাপাকিভাবে ভারতে চলে আসেন। তারপর থেকে কেউ যায়নি। আমাদের বাড়ি এখনও কেউ দখল করেনি। বাংলাদেশ উপ দূতাবাসের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, জমি বেদখল না হওয়ায় সুবিধা হয়েছে। আমরা আবেদন করলেই বাংলাদেশ সরকার জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রক সেই জমিতে পাঠাগার বা অন্য কিছু তৈরি করতে পারে। আমি আরও বলেছি, অন্তত একবার পিতৃপুরুষের ভিটে দেখে আসতে চাই। বাংলাদেশ সরকার যদি আমাকে বগুড়ায় যাওয়ার অনুমতি দেয়, তাহলে সেই আশা পূর্ণ হবে। সে বিষয়েও বাংলাদেশ উপ দূতাবাসের আধিকারিকদের কাছ থেকে সদর্থক সাড়া পেয়েছি। আশা করি একবার বগুড়ায় যেতে পারব।’ সুব্রতবাবুর স্ত্রী তন্দ্রা দেবী বলেছেন, ‘আমরা কিছু চাই না। শুধু চাই বাংলাদেশে প্রফুল্ল চাকীর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হোক। বাংলাদেশ উপ দূতাবাসের আধিকারিকরা বলেছেন, প্রফুল্ল চাকীর জন্ম বগুড়ায় হওয়ায় তাঁরা এই বিপ্লবীকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবেই দেখছেন। তাঁরা আশ্বাস দিয়েছেন, পাঠাগার বা অন্য কিছু করবেন। তবে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ সরকার। আজকের আলাপচারিতা যেভাবে হয়েছে, তাতে আমি আশাবাদী, কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার আমার স্বামীর পূর্বপুরুষের জমি অধিগ্রহণ করে কাজ শুরু করে দেবে।’
অন্য বিপ্লবীদের স্মৃতিও সংরক্ষণ করা হবে?
১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্ট ভারত ভেঙে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান গঠনের পর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতি সংরক্ষণের বদলে ধ্বংস করার কাজ শুরু হয়ে যায়। অখণ্ড ভারতের পূর্ববঙ্গে যত বিপ্লবী ছিলেন, তাঁদের বাসভবন বা বিপ্লবী কার্যকলাপের কেন্দ্রগুলি সংরক্ষণের কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেন ও তাঁর সহযোগীদের লড়াই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও, বর্তমান বাংলাদেশে সেসবের কোনও নিদর্শনই নেই। এ বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের শেরপুর জেলার বাসিন্দা প্রণয় চন্দ্র সুশীল। এই যুবক বলেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার আগে তো একটাই দেশ ছিল। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গঠনের পর ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো থাকারই কথা ছিল। কিন্তু গত শতকের আটের দশক থেকে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কে অনেক টানাপোড়েন দেখা গিয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে তো ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। আমাদের আশা, বর্তমান সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতা দূর করতে পারে। আমরা সবাই সে দিকেই তাকিয়ে আছি। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক বীর বিপ্লবীই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সন্তান ছিলেন। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম প্রফুল্ল চাকী, মাস্টারদা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারদের কথা জানেই না। ওদের এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিষয়ে জানা উচিত। প্রফুল্ল চাকীর জন্মভিটেতে যদি এমন কোনও কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, যার মাধ্যমে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ করা যাবে, তাহলে সবাই এই বিপ্লবীর কথা জানতে পারবে। আমরা সবাই এই বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাঁরা দেশের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের কথা জানলে আমাদের সন্তানরা অনুপ্রাণিত হবে। বাংলাদেশ সরকার চাইলেই বগুড়ায় এমন কিছু করতে পারে। আশা করি সরকার সেই উদ্যোগ নেবে।’ প্রণয়ের মতোই বাংলাদেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অনেক মানুষেরই আশা, যাবতীয় জটিলতা দূর হয়ে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান হবে।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


