
বিদেশি দেখলেই আমরা চামচ-কাঁটা তুলে নিই। ভাবি, হাত দিয়ে খাওয়া ‘আনস্মার্ট’। অথচ আমাদের ঠাকুমা-দিদিমারা সারাজীবন হাত দিয়ে মেখে ভাত খেয়ে ৯০ বছর বাঁচতেন। আয়ুর্বেদ বলছে, ৫টা আঙুল মানে পঞ্চতত্ত্ব – মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ। ভাত মাখার সময় এই ৫ তত্ত্ব অ্যাক্টিভ হয়, হজমের এনজাইম বেরোয়, ব্রেনে সিগন্যাল যায় ‘খাবার আসছে’। ফলে সুগার ধীরে বাড়ে, পেট ভরে যায়, মোটা হওয়া আটকায়। রইল হাত দিয়ে খাওয়ার ৬টা বিজ্ঞানভিত্তিক গুণ।
রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফ্রায়েড রাইস চামচ দিয়ে খাচ্ছেন, আর বাড়িতে মাছের ঝোল-ভাত হাত দিয়ে মেখে খাচ্ছেন – কোনটা বেশি তৃপ্তি দেয়? ৯০% বাঙালি বলবে, ‘হাত দিয়ে মেখে খাওয়া’।
কিন্তু আমরা লজ্জা পাই। অফিসের পার্টি, বিদেশি ক্লায়েন্ট – সামনে এলেই চামচ খুঁজি। ভাবি, হাত দিয়ে খাওয়া বুঝি ‘গ্রাম্য’।
অথচ হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল থেকে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি – সব গবেষণা বলছে, হাজার বছরের এই ভারতীয় প্রথা আসলে সুপার-সায়েন্টিফিক। চামচ নয়, আপনার ৫টা আঙুলই সেরা ডাক্তার।
হাত দিয়ে ভাত খেলে শরীরে কী কী ম্যাজিক হয়? রইলো ৬টা গুণ:
১. হজমের ‘সুইচ অন’ হয়ে যায় – আয়ুর্বেদের পঞ্চতত্ত্ব: আয়ুর্বেদ মতে, আমাদের ৫টা আঙুল পঞ্চভূতের প্রতীক। - বুড়ো আঙুল: আগুন – হজমের শক্তি - তর্জনী: বায়ু – গ্যাস কন্ট্রোল - মধ্যমা: আকাশ – ফাঁকা জায়গা, শোনার ক্ষমতা - অনামিকা: পৃথিবী – স্থিরতা, শক্তি - কনিষ্ঠা: জল – ফ্লো, চলাচল
যখন ভাত-ডাল-মাছ মেখে খাই, ৫টা আঙুল একসাথে হয়। ব্রেন সিগন্যাল পায় – ‘খাবার রেডি’। পেটে হজমের অ্যাসিড, লালার এনজাইম বেরোতে শুরু করে। ফলে খাবার পেটে পড়ার আগেই হজম প্রসেস শুরু। গ্যাস, অ্যাসিডিটি, কনস্টিপেশন কমে।
চামচ দিয়ে খেলে এই সিগন্যাল যায় না। খাবার ‘সারপ্রাইজ’ হয়ে পেটে পড়ে। হজম দেরিতে হয়।
২. ডায়াবেটিস ও মোটা হওয়া আটকায় – ন্যাচারাল স্পিড ব্রেকার আমেরিকার ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন জার্নালে গবেষণা বলছে, যারা হাত দিয়ে খায়, তারা চামচ দিয়ে খাওয়া লোকের চেয়ে ১৫-২০% কম খায়।
কারণ ৩টে: প্রথম: হাত দিয়ে মেখে খেলে খাবার ধীরে খাওয়া হয়। ব্রেনের ‘পেট ভরেছে’ সিগন্যাল আসতে ২০ মিনিট লাগে। চামচে ৭ মিনিটে প্লেট ফাঁকা। ততক্ষণে ২য় প্লেট নিয়ে নিয়েছেন। ফলে ওভারইটিং, ওজন বাড়ে। দ্বিতীয়: আঙুলে থার্মোরিসেপ্টর আছে। গরম ভাত-ডাল ধরলে বোঝা যায় ‘কতটা গরম’। ব্রেন বডি টেম্পারেচার অ্যাডজাস্ট করে। হুট করে গরম খাবার পেটে গেলে সুগার স্পাইক করে। তৃতীয়: মেখে খেলে ভাত, ডাল, সবজি, মাছ – সব মিশে যায়। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কমে। মানে সুগার ধীরে রক্তে মেশে। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য আশীর্বাদ।
৩. ‘মাইন্ডফুল ইটিং’ হয় – স্ট্রেস কমে চামচ দিয়ে খাওয়ার সময় আমরা টিভি দেখি, ফোন ঘাঁটি। খাবারের স্বাদ, গন্ধ, টেক্সচার টের পাই না। এটাকে ‘মাইন্ডলেস ইটিং’ বলে।
হাত দিয়ে খেলে ফোন ধরা যায় না। বাধ্য হয়ে খাবারের দিকে মন দিতে হয়। ভাতের দানা, মাছের কাঁটা, ডালের ঘনত্ব – আঙুলে ফিল হয়। এটা মেডিটেশনের মতো। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমে, হ্যাপি হরমোন সেরোটোনিন বাড়ে।
যোগশাস্ত্রে একে বলে ‘আহার শুদ্ধি’। মন দিয়ে খেলে খাবারের পুষ্টি ১০০% শরীর নেয়।
৪. হাতের ব্যাকটেরিয়া ‘গুড ব্যাকটেরিয়া’ শুনে ঘেন্না লাগছে? ভয় নেই। আমাদের হাতে ‘নরমাল ফ্লোরা’ নামে কোটি কোটি ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে। সাবান দিয়ে ধুলে খারাপ জীবাণু মরে, কিন্তু ভালো ব্যাকটেরিয়া চামড়ায় লেগে থাকে।
এই ব্যাকটেরিয়া পেটে গিয়ে গাট-হেলথ ভালো রাখে, ইমিউনিটি বাড়ায়, B12 ভিটামিন বানাতে হেল্প করে। আমাদের দিদিমারা বলতেন, ‘একটু এঁটো হাতে খা, পেট ভালো থাকবে’ – বিজ্ঞান এখন সেটাই বলছে।
অবশ্যই খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। কিন্তু স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ‘বন্ধ্যা’ করে খেলে এই গুড ব্যাকটেরিয়া পাবেন না।
৫. টাইপ-২ ডায়াবেটিস রিস্ক ৩০% কমে – রিসার্চ বলছে জার্নাল অফ দ্য অ্যাকাডেমি অফ নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিক্স-এর রিপোর্ট: যারা রোজ হাত দিয়ে মেখে খায়, তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার রিস্ক ২৯% কম। কারণ ব্লাড সুগার স্পাইক কম হয়, ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ে।
ভারতের ICMR বলছে, বাঙালির ডায়াবেটিসের বড় কারণ ‘তাড়াহুড়ো করে গেলা’। হাত দিয়ে খেলে গেলা কমে, চিবানো বাড়ে। ১ গ্রাস ভাত ৩২ বার চিবানোর নিয়ম আয়ুর্বেদে। চামচে সেটা হয় না।
৬. শরীর-মনের ব্যালেন্স আসে – ‘মুদ্রা থেরাপি’ যোগে ‘অন্ন মুদ্রা’ বলে একটা ব্যাপার আছে। বুড়ো আঙুলের ডগা দিয়ে তর্জনী ও মধ্যমা ছুঁয়ে খাবার মুখে তোলা। এতে ‘প্রাণ মুদ্রা’ তৈরি হয়। নার্ভাস সিস্টেম শান্ত হয়, রাগ কমে, মনোযোগ বাড়ে।
খেয়াল করে দেখবেন, বাচ্চারা হাত দিয়ে খেতে দিলে শান্ত হয়ে খায়। চামচ দিলে ছড়ায়, খেলে না। কারণ হাত-মুখ-ব্রেন কানেকশন।
তাহলে কি চামচ খারাপ? কখন হাত, কখন চামচ? চামচ খারাপ নয়। স্যুপ, নুডলস, পায়েস – চামচেই সুবিধা। বাইরে, ট্রেনে, হাইজিন মেইনটেইন করতে না পারলে চামচই ভালো।
কিন্তু বাড়িতে, নিজের রান্না করা গরম ভাত-ডাল-মাছ – হাত দিয়ে মেখে খান। খাওয়ার ২০ মিনিট আগে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন। নখ ছোট রাখুন।
বিদেশিরাও মানছে: ইউরোপ-আমেরিকায় এখন ‘Hand-to-Mouth Movement’ চলছে। নিউ ইয়র্কের রেস্টুরেন্টে ‘ইট উইথ ইয়োর হ্যান্ডস’ নাইট হয়। ওরা বুঝেছে, চামচ শুধু টুল, হাত হল এক্সপেরিয়েন্স। লজ্জা নয়, গর্ব করুন। আপনার ৫টা আঙুল ৫০০০ বছরের বিজ্ঞান। চামচ-কাঁটা ওয়েস্টার্ন কালচার, হাত দিয়ে খাওয়া ভারতীয় ‘কালচার + ক্যালকুলেশন’। তাহলে ডাল-ভাত-আলুভাজা হাত দিয়ে মেখে খান। চোখ বন্ধ করে প্রথম গ্রাসটা মুখে দিন। টের পাবেন, মা-ঠাকুমার হাতের স্বাদটা আসলে আপনার নিজের হাতেই লুকিয়ে ছিল।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News