
সকালে স্কুলের তাড়া, অন্যদিকে অফিসে যাওয়ার টেনশন। ঠিক তখনই বাচ্চারা জুতো পরতে গিয়ে বায়না জুড়ে দেয়। কখনও জলের বোতল চায়, তো কখনও আরও কিছুক্ষণ খেলার জন্য কাঁদতে থাকে। বাবা-মায়েরা যত তাড়া দেন, বাচ্চারা তত বেশি জেদ করে। প্রায় সব বাড়িতেই এমন ছবি দেখা যায়। কিন্তু বাচ্চারা কি ইচ্ছে করেই এমন করে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে? বাচ্চাদের এমন আচরণ নিয়ে হওয়া গবেষণায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
খেলার সময় বাড়ি ফিরতে বললে কাঁদা, টিভি বন্ধ করতে বললে রেগে যাওয়া বা স্কুলে যাওয়ার সময় জামা পরতে না চাওয়া— এমন পরিস্থিতিতে অনেক বাবা-মা ভাবেন বাচ্চা খুব জেদি। কিন্তু ছোটদের আচরণ বুঝতে গেলে তাদের বয়স, চিন্তাভাবনা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার কথা মাথায় রাখতে হবে। বড়দের কাছে একটা কাজ থামিয়ে অন্য কাজ শুরু করা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ছোটদের জন্য মাঝপথে কিছু থামানো বেশ কঠিন। এর আরেকটা কারণ হলো বাচ্চাদের মস্তিষ্কের বিকাশ। একটা কাজ থেকে মন সরিয়ে অন্য কাজে দেওয়া বা নিজের ইচ্ছেকে দমিয়ে রাখাকে 'এক্সিকিউটিভ ফাংশন' বলে। ছোট বয়সে এই ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না।
ধরুন, স্কুল বাস আসার সময় হয়ে গেছে। বাবা-মায়েরও অফিসে জরুরি কাজ আছে। কিন্তু বাচ্চা কিছুতেই ইউনিফর্ম পরতে চাইছে না। প্রথমে বুঝিয়ে বললেও সময় পেরোলে বাবা-মায়েরা বকাঝকা শুরু করেন। এতে বাচ্চা আরও বেশি কাঁদতে বা জেদ করতে শুরু করে। এখানে বাবা-মা দেরি হওয়ার চিন্তায় থাকেন, আর বাচ্চা তার পছন্দের কাজ থামাতে হচ্ছে বলে বিরক্ত হয়। দু'পক্ষই চাপে থাকলে সমস্যা আরও বাড়ে। বাচ্চা যখন কষ্ট পায়, তখন তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। শান্তভাবে কথা বলুন। যেমন বলতে পারেন, "আমি জানি তুমি আরও খেলতে চাও, কিন্তু এখন আমাদের বাড়ি যেতে হবে।" এতে তারা কথা শোনে।
ছোট বাচ্চাদের মধ্যে রেগে গিয়ে কাঁদা, চিৎকার করা বা মাটিতে শুয়ে পড়ার মতো আচরণ প্রায়ই দেখা যায়। ২০২২ সালে 'জার্নাল অফ ডেভেলপমেন্টাল অ্যান্ড বিহেভিয়ারাল পেডিয়াট্রিক্স'-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ৮৬১ জন শিশুর জেদ নিয়ে বাবা-মায়ের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেদ করার প্রবণতা কমলেও, কতক্ষণ ধরে জেদ করছে তাতে বদল আসে। ২০২৩ সালে 'রিসার্চ অন চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকোপ্যাথলজি' জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ৯৪ জন ছোট বাচ্চাকে এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, বাচ্চাদের ওপর বেশি চাপ দিলে বা শাসনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা না থাকলে জেদের মাত্রা বেড়ে যায়।
"কান্না থামা"— এমন কথা বলার বদলে বলুন, "আমি জানি তুমি আরও খেলতে চাও, কিন্তু এখন যাওয়ার সময় হয়েছে।" বাচ্চাদের সব কিছু নিজেদের ইচ্ছেমতো করতে ইচ্ছে হতে পারে। তাই তাদের দুটো অপশন দিন। যেমন জিজ্ঞেস করতে পারেন, "তুমি কি নীল জুতোটা পরবে নাকি লালটা?" এতে বাচ্চার মনে হবে তার মতামতেরও দাম আছে। পার্ক থেকে ফেরার সময় হঠাৎ করে না বলে, পাঁচ মিনিট আগেই সতর্ক করুন। বাচ্চা খুব বেশি কাঁদলে তখন বড় বড় লেকচার দেবেন না। ছোট কথায় ভরসা দিন। সকালের তাড়া কমাতে আগের রাতেই স্কুল ব্যাগ, ইউনিফর্ম আর জলের বোতল গুছিয়ে রাখুন।
চারপাশের লোকজন কী ভাববে, সেই চিন্তায় অনেক বাবা-মা সবার সামনে বাচ্চাকে বকাঝকা করেন বা মেরে বসেন। এমন সময়ে অন্যের কথার চেয়ে বাচ্চার পরিস্থিতির দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত। সম্ভব হলে তাকে একটা শান্ত ও নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান। বাচ্চা কাঁদছে বলেই যে আপনার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে হবে, এমনটা নয়। শান্তভাবে বুঝিয়ে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিন। বাচ্চা শান্ত হওয়ার পর, কেন তার রাগ হয়েছিল তা নিয়ে কথা বলুন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এলে কীভাবে সামলাতে হবে, তা ধীরে ধীরে শিখিয়ে দিন।
বাচ্চাদের মাঝে মাঝে জেদ করাটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু যদি দেখেন তারা খুব ঘন ঘন মারাত্মক জেদ করছে, অস্বাভাবিকভাবে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছে, নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করছে এবং এর ফলে রোজকার কাজে সমস্যা হচ্ছে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছেও যেতে পারেন। বাচ্চার জেদের পেছনের আসল কারণটা বোঝার চেষ্টা করুন। বাবা-মা তাড়াহুড়োয় থাকলেই হয়তো বাচ্চারা বেশি ঘ্যানঘ্যান করে। কিন্তু সব সময় তারা ইচ্ছে করে এমনটা করে না। পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললে তারা নিজেরাই নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News