
Yawning: সাধারণত মানুষ মনে করে হাই তোলা মানেই হলো ঘুমের প্রয়োজন বা ক্লান্তি অনুভব করা। কিন্তু এর পেছনে কেবল এই কারণগুলোই নেই। শরীর শিথিল হলে, মনোযোগ হারিয়ে ফেললে কিংবা এক কাজ থেকে অন্য কাজে যাওয়ার সময়ও আপনি হাই তুলতে পারেন। আপনার মস্তিষ্ক ও শরীরের পেশিগুলো মিলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে। এতে আপনি মুখ বড় করে খোলেন, গভীর শ্বাস নেন এবং ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দেন।
এ সময় আপনার মুখমণ্ডল, চোয়াল এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশিগুলো একত্রে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা এখনও এর সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ খুঁজে পাননি। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, এটি হয়তো মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, সতর্কতার মাত্রায় পরিবর্তন আনে অথবা শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিবর্তী ক্রিয়া (reflex) হিসেবে কাজ করে। তাই প্রতিবার হাই তোলা মানেই যে আপনার ঘুমের অভাব রয়েছে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। যদিও এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবুও অতিরিক্ত হাই তোলা এবং অস্বস্তি বোধ করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হাই তোলা বিষয়ক গবেষণায় মস্তিষ্কের তাপমাত্রা একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা হাই তোলা এবং ঘরের তাপমাত্রার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে হাই তোলা ভূমিকা রাখতে পারে।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের পাশাপাশি মুখমণ্ডল ও মাথার নড়াচড়া মস্তিষ্ককে শীতল রাখতে সহায়তা করে। তবে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে কেবল মস্তিষ্ককে ঠান্ডা করার জন্যই মানুষ হাই তোলে। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
গবেষকরা গ্রীষ্ম ও শীতকালে মানুষের হাই তোলার ধরন নিয়েও পর্যবেক্ষণ করেছেন। কিছু ফলাফলে দেখা গেছে যে, বাইরের তাপমাত্রার পরিবর্তন হাই তোলার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাইরে অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা থাকলে আপনার হাই তোলার ধরনে ভিন্নতা আসতে পারে। তবে শীতকালে শরীরে বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় বলেই মানুষ বেশি হাই তোলে—এমন কথা বলার মতো যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের কাছে নেই।
অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখে যখন আপনারও হাই তোলার ইচ্ছা জাগে, তখন তাকে বলা হয় 'সংক্রামক হাই তোলা' (contagious yawning)। এটি অত্যন্ত সাধারণ ও কৌতূহলোদ্দীপক একটি আচরণ। বিজ্ঞানীদের মতে, অন্য মানুষের মুখের ভঙ্গি বা নড়াচড়ার প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ার কারণেই এমনটা ঘটে।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, কেউ কেউ কেবল অন্যদের হাই তোলার ভিডিও দেখেই হাই তুলতে শুরু করেন। ২০০৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিশেষভাবে দেখা হয়েছিল যে, অন্যকে হাই তুলতে দেখে মানুষ কীভাবে হাই তোলে। এসব গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে, হাই তোলা কেবল একটি শারীরিক ক্রিয়া নয়; অন্যের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেও এটি শুরু হতে পারে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এর জন্য সরাসরি কাউকে দেখারও প্রয়োজন নেই। কেবল এ বিষয়ে পড়া বা কথা বলার মাধ্যমেও হাই তোলার অনুভূতি হতে পারে। আপনার চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ সহজেই এই স্বাভাবিক প্রতিবর্তী ক্রিয়াটিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই নিবন্ধটি পড়ার সময়ও হয়তো আপনার হাই উঠতে পারে!
অন্য কারো কাজ বা আচরণ অনুকরণ করার সময় আপনার মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষকরা এক্ষেত্রে 'মিরর নিউরন' নামক বিশেষ স্নায়ুকোষের কথা উল্লেখ করে থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে যে, আপনি যখন নিজে কোনো কাজ করেন কিংবা অন্য কাউকে সেই কাজ করতে দেখেন, তখন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশ প্রতিক্রিয়া দেখায়।
তবে সংক্রামক হাই তোলার পেছনে মিরর নিউরনই একমাত্র কারণ কি না, তা বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি। তাদের মতে, এক্ষেত্রে মস্তিষ্কের একাধিক প্রক্রিয়া, আপনার মনোযোগের ব্যাপ্তি এবং মেজাজ বা মানসিক অবস্থা—সবকিছুই যৌথভাবে কাজ করে। কিছু গবেষণায় এও দেখা গেছে যে, আপনার ঘনিষ্ঠ কেউ হাই তুললে আপনারও হাই তোলার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সাথে আপনার সম্পর্কের গভীরতা এই প্রতিক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তারা একে আবেগ শনাক্ত করা এবং আচরণের প্রতি সাড়া দেওয়ার মতো সামাজিক বৈশিষ্ট্যের সাথে যুক্ত করে দেখেন। তবে কেবল হাই তোলার প্রতিউত্তরে হাই তোলা থেকেই গভীর ভালোবাসা বা দৃঢ় বন্ধনের প্রমাণ পাওয়া যায় না। সামাজিক বন্ধন এখানে অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে একটি মাত্র।
হাই তোলার এই সংক্রামক প্রবণতা কেবল মানুষের মধ্যেই নয়, কিছু প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়। গবেষকরা বিশেষ করে কুকুর ও শিম্পাঞ্জির মতো প্রাণীদের মধ্যে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছেন। প্রাণীদের পারস্পরিক সামাজিক বন্ধনের সাথে এই আচরণের কী সম্পর্ক, তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা চালানো হয়েছে।
২০২০ সালে হাতির আচরণের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা হয়েছিল, পরিচিত মাহুত বা পরিচর্যাকারীকে হাই তুলতে দেখলে হাতিরাও হাই তোলে কি না। এই পর্যবেক্ষণগুলো মানুষ ও প্রাণীর মধ্যকার সামাজিক বন্ধন কীভাবে হাই তোলার বিষয়টিকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে কৌতূহলজাগানিয়া সব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে প্রাণীরা কেন হাই তোলে, তা পুরোপুরি বোঝার জন্য বিজ্ঞানীদের আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
এই প্রতিবেদনটা পড়তে গিয়ে আপনি কতবার হাই তুললেন, কমেন্টে জানান আমাদের-
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News