
তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়কে ধুয়ে দিলেন শোভন চট্টোপাধ্য়ায়ের বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি বেসরকারি সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দায়ী। তিনি বলেন, যে দল সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছিল টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল সেই দলটি নির্বাচনে হারার পরে ১৫ মাসও টিকলো না। এক মাসের মধ্যেই উবে গেলো। বৈশাখীর কথায় এটাই হওয়ার ছিল।
বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের নিশানায় সদ্যো দলবদলু ফিরহাদ হাকিম। বৈশাখী বলেন, শোভনকে মেয়র পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, তাঁকে সামনে রেখেই এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। বৈশাখী বলেন, 'শোভন মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরেই ফিরহাদকে বসানো হয়। কিন্তু কলকাতার কোনও উন্নয়ন হয়নি। আমরা একটা টকেটিভ মেয়র পেলাম কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না।' বৈশাখী আরও বলেন,'মমতা আমার সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেছেন। শোভনকে সরিয়ে ফিরহাদকে মেয়র করেছেন, যার যোগ্যতাই নেই। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। অনেক আগেই ডানা ছাঁটা দরকার ছিল ফিরহাদের। আর ওই দলের কাকে বের করবে, সবাই তো চোর...'
বৈশাখী নিশানা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ও। তাঁর আর শোভনের সম্পর্ককে প্রকাশ্যে এনেছেন মমতা। অভিযোগ করেন বৈশাখী। তিনি বলেন, 'আমি চাইনি শোভনকে সকলের সামনে রাখি পরিয়ে পিছনে অন্য সম্পর্ক রাখতে। তাই দু'জনের সিদ্ধান্তে মমতাদিকে সবটা জানিয়েছিল শোভন। এরপর বিধানসভা থেকে শুরু করে সব মিটিংয়ে আমি আলোচনার বস্তু হয়ে গেলাম। আমাকে ঘর থেকে বের করে বাজারে বিক্রি করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উনি শোভনকে বলেছিলেন, কীরে প্রেম করবি না কাজ করবি?' বৈশাখীর কথায় তারপর থেকেই দলের মধ্যে ধীরে ধীরে কোনঠাসা হতে শুরু করেন শোভন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রীতিমত তুলোধনা করেন বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্য়ায়। তিনি বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায় শুভেন্দু অধিকারীর সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের। বৈশাখীর অভিযোগ, মমতার স্মৃতিশক্তি খুবই দুর্বল। তিনি সবকিছু ভুলে যান।তার মাসুল দিচ্ছেন। একটা দলের এই পরিণতি লজ্জাজনক ও মর্মান্তিক। তিনি আরও বলেন, ২০২১ সালের পরে দলবদল করে শোভন যখন তৃণমূলের ফিরেছিলেন, সেই সময় নবান্নে বৈশাখীকে ডাকার পরই তাঁকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের ভূমিকা দ্বিচারিতা ছিল বলেও অভিযোগ করেন বৈশাখী।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়কেও নিশানা করেন বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, 'একটা বাচ্চা ছেলে জন্মদিন পালন করছে, আর দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদরা একটা ছবি তোলার জন্য অপেক্ষা করছেন! এটা দেখলেই আমার খারাপ লাগত। দলটা কর্পোরেট হয়ে গিয়েছে। শোভন আর শুভেন্দুবাবু আইপ্যাকের বিরোধিতা করেছিল। কোনও লাভ হয়নি। তারপর ওনারা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।'
বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, শোভন-শুভেন্দু এঁরা মাটি থেকে লড়াই করে উঠে আসা নেতা। তাঁরা কখনই আইপ্যাক মেনে নিতে পারেননি। তারা তৃণমূলের সাফল্যের চরম সীমায় ছিলেন। নিজেদের রাজনীতির সাফল্যের শিখরে ছিলেন। কিন্তু সেই সময়ই পদ ছেড়ে, দল ছেড়ে ইস্তফা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বিজেপিতেও শুভেন্দু অধিকারী লড়াই করে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।
যদিও তৃণমূলের এই দুর্দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের পাশে দেখা গিয়েছিল শোভন চট্টোপাধ্য়ায়কে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের ওপর ডিম হামলার পরেই মমতার পাশে দেখা গিয়েছিল তাঁর প্রিয় কাননকে। হাসপাতালেও মমতার পাশে ছিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু সেই সময় বৈশাখী শোভনকে আকাননি কেন? বৈশাখী বলেন, 'বাধা দিলে নিজের কাছেই ছোট হতাম।' তিনি আরও বলেন, মমতা দূরে ঠেলে দিলেও শোভন মমতাকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। নিজের পরিবারের সদস্য বলে মনে করেন।
অরূপ-অনন্যা জুটি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন বৈশাখী। পুরনো দিনের কথা টেনে তিনি বলেন, 'আমাদের অনেক আগে থেকে অরূপ-অনন্যা রংমিলান্তি করতেন। অনন্যা আমার ব্যক্তিগত জীবনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। আমি বাধা দিই। একটা সিনেমার প্রিমিয়ারে গিয়ে দেখছি অনন্যার আঁচল সরে শোভনের মাথায়। প্রতিবাদ করায় বুক ঠুকে ভয়ংকর কথা বলেছিলেন তিনি।' বৈশাখী বলেন, অনন্যার সঙ্গে তাঁর ঝগড়াঝাটি হয়। সেই সময় অনন্যা বলেছিলেন, মেয়র-মন্ত্রীদের খুশি করতে হয় তাঁকে। বৈশাখীর প্রশ্ন, খুশি করেই কাউন্সিলর হবেন?
বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্য়ায় বলেন, মমতা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন তাঁকে ঘিরে থাকত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। তিনি আরও বলেন, সেইসময় মমতা দলের নেতা কর্মীদের পাত্তা দিতেন না। কিন্তু এখন হারের পরে তারা কেই মমতার পাশে নেই। এখন শোভনই রয়েছে মমতার পাশে রয়েছেন।
১৫ বছরে রাজনীতির কিছু নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে ক্যারিশ্মা আগে ছিল তা আর এখন নেই। যার থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। বৈশাখী বলেন, এখন দলের যা অবস্থা তাতে স্পষ্ট ১৫ বছরে রাজনীতির ভিতরে একটি ভয়ঙ্কর কঙ্কাল ছিল। শুভেন্দু অধিকারী বাংলার জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন। বৈশাখী শুভেন্দুর প্রশংসাও করেন।