বাংলা চলচ্চিত্র জগতের তিন মহারথী, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেন, যাদের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র শ্রেষ্ঠত্বের সন্মান অর্জন করেছিল বিশ্ব দরবারে। কলেজ জীবনে পড়াকালীন সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু মৃণাল সেন-এর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় পালা। এরপরই পা রাখা চলচ্চিত্র জগতে। এক, একের পর দুই, স্থানীয় মানের সন্মান এনে দিলেও আন্তর্জাতিক স্তরে তার পরিচিতি ঘটে তৃতীয় ছবি বাইশে শ্রাবণের হাত ধরেই। আজ তারই জন্মতিথিতে রইল চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মৃণাল সেন-এর জানা অজানা কাহিনী।

১৯৫৫ সালে পরিচালনার কাজে হাতেখড়ি হয় রাত ভোর ছবির মধ্যে দিয়ে। সামাজিক পটভূমিতেই ছবি তৈরি করতে পছন্দ করতেন তিনি। বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি দর্শককে এনে দাঁড়করিয়ে দেওয়ার মতন পটভূমি ঘিরে থাকত তার চিত্রনাট্যকে। অনেকের মতে ভূবণ সোম তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, অপর দিকে কলকাতা ট্রিলজিও তার জীবনের অন্যতম পরিচিতি।

কলকাতা ট্রিলজি, সত্তরের দশকের উত্তাল পরিস্থিতি, মানুষের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছিল পরিচালকের এই সিনেমাত্রয়-এ। ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১ ও পদাতিক। এরপর একে একে কালজয়ী ছবি তৈরি করেছেন মৃণাল সেন। অথচ পরিচালক প্রথমজীবনে খুব একটা সিনেমা দেখতেন না, জীবনে প্রথম দেখা তিনটি ছবির মধ্যে ছিল চ্যাপলিনের কিড। ভালোলেগে যায় ছবিটি, এরপর সম্পূর্ণ সিরিজ দেখা ভেনিস চলচ্চিত্র ফেস্টিভাল-এ, যেখানে তার ছবি কলকাতা ৭১-ও দেখানো হয়েছিল। তিনি দিনের অধিকাংশ সময়ই চ্যাপলিন দেখতে পছন্দ করতেন।

দেশভাগ তার ছবিতে সেভাবে উঠে না আসলেও তিনি কলকাতার পরিস্থিতির দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কলকাতার সংস্কৃতি, পরিস্থিতি, বাস্তবতা, সবই তাকে ছুঁয়ে যেত প্রতিমুহুর্তে। তিনি বই পড়তে বেশি পছন্দ করতেন। নিজের কলকাতাকে জানতে পছন্দ করতেন। আর এই সকল ভাবই তার ছবিতে কখনও না কখনও অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

মোটের ওপর ২৯টি ছবি তিনি পরিচালনা করেন, শুধু তাই নয় ছোটপর্দায়ও তিনি পরিচালনা করেন ১৪টি টিত্রনাট্যে, যার অধিকাংশই আশির দশকে সম্প্রচারিত হয়েছিল। মৃণাল সেন তার কালজয়ী পরিচালনার জন্য পেয়েছিলেন দাদা সাহেব ফালকে, পদ্মভূষণ পুরষ্কারও। ২০১৮ সালে ৩০শে ডিসেম্বর তিনি মত্যুবরণ করেন, দীর্ঘ ৯৫ বছর জীবদ্দশায় সাতটি চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন তিনি। মৃণাল সেন-এর প্রতিটি ছবিতে বাস্তবের কঠোর ছাপ যেন জীবন্ত হয়ে উঠত চরিত্রের মাধ্যমে, তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, আমি শিক্ষক ছিলাম না, কোনও অভিনেতা অভিনেত্রীদের ওপর কিছু চাপিয়ে দিতাম না, তারা নিজেদের মতন করে চরিত্রগুলো ফুঁটিয়ে তুলতেন, নিজস্বতা বজায় রাখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।