১৯৪৭ সাল, একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের বুক ভরা আবেগ ঠিক তখনই আরেক শ্রেণীর মানুষ অর্থিক অনটন, দারিদ্রর চরমসীমায় পৌঁচ্ছে কোনও মতে জীবন যাপনের পথ খুঁজে ফিরছে। ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নয়া রূপে পাচ্ছে দেশের প্রতিটা ক্ষেত্রে। ছবির যগত তখন হোয়াইট টেলিফোনিক মুভি। বিলাসিতা, রোম্যান্স, ঝাঁচকচকে ফ্রেমেই গাঁথছে ফ্রেম। হিন্দি ছবির জগতে দীর্ঘ ১৫ বছর থাকল না কোনও দেশভাগ, সাধারণের গল্পের ছাপ। অন্যদিকে ঠিক এই একই সালে নব্যবাস্তবতাবাদের জোয়ারে ভাসছে গোটা ইতালি। যার খানিকটা বাংলা চলচ্চিত্রে প্রবেশ করল সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। তৈরি হল পথের পাঞ্চালি। না, দেশভাগ সেই গল্পে স্থান না পেলেও কঠিন বাস্তবকে পর্দায় যত্নের সঙ্গে এঁকে বাংলা চলচ্চিত্রকে এক নতুন পথ দেখালেন তিনি। সাধারণকে যে সাধারণভাবে সাধারণের গল্পই বলা সহজ, তা যে বড় কাছে, চেনা, স্বপ্ন নয়, কঠিন বাস্তব, তার স্বাদ পেল ভারতের চলচ্চিত্র জগত। 

১৯৫১ সালে মুক্তি পেয়েছিল নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল। দেশভারে ফলে ভিটে মাটি খুইয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষ মাথার ওপর ছাদের খোঁজে পথে পথে দিন কাটাচ্ছে, কীভাবে শিয়ালদহ স্টশনে শয়ে শয়ে মানুষ খিদের জ্বালায় হাত পাতছে, তা সবটাই ধরা পড়েছিল এই ছবিতে। সলিল সেনে নতুন ইহুদি-ই হোক কিংবা শান্তিপ্রিয় চট্টোপাধ্যায়ের রিফিউজি, দেশভাগের যন্ত্রণা, শিকড় ছেঁড়ার কঠিন বাস্তবের কাহিনি ঘটকই প্রথম যিনি শিল্পের সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধনে প্রতিটা ফ্রেমে মানুষের মননে চাবুক মারেন। 

ঋত্বিক ঘটক, সমান্তরাল ছবির জগতে এক ভিন্ন ঘরানার স্বাদ মেলে তাঁরই হাত ধরে। যাঁর প্রতিটা পদক্ষেপে সৃষ্টি ছবি যেন তৎকালিন সমাজের এক জ্বলন্ত-জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মধ্যবৃত্তের যন্ত্রণা থেকে শুরু করে ৭১-এর সংগ্রাম, দেশভাগ থেকে শুরু করে দারিদ্রের যন্ত্রণা, সবই যেন স্থান পেয়েছিল এই পরিচালকের সৃষ্টি ফ্রেমে। কেবল গল্প বা তার উপাখ্যানই নয়, মিউজিক থেকে শুরু করে সংলাপ, চরিত্রের বুনন সবই যেন এক কথায় কঠোর বাস্তবের একটুরো অধ্যায়। 

ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫১) সিনেমার মধ্য দিয়েই, যা দেশভাগের কথাই বলে চলেছিল প্রতিটা পর্বে। তিনি একই সাথে অভিনয় ও সহকারী পরিচালকের কাজ করেন। এর দু'বছর পর তাঁর একক পরিচালনায় মুক্তি পায় নাগরিক। দু'টি চলচ্চিত্রই ভারতীয় চলচ্চিত্রের গতানুগতিক ধারাকে জোর ঝাঁকুনি দিতে সমর্থ হয়েছিল। এরপর খানিক বিরতি, মুম্বইয়ে চলচ্চিত্রের শিক্ষকতা করেই কাটছিল দিন। কয়েকবছরই পর আবার লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন, ৭০-এর দশক। টলিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় তখন রোম্যান্টিক ছবির মোড় থেকে বেরিয়ে পরিণত হওয়ার পথে। এমনই সময় কলকাতা ট্রিলজি জন্ম নিল ঘটকের হাতে, সৃষ্টি হল মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) এবং সুবর্ণরেখা (১৯৬২)।

সিনেমা আমার চোখে অভিমান-দুঃখ মানুষের কাছে তুলে ধরার মিডিয়াম, এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। ভিট মাটি হারানোর বেদনা, অভাব, না-পাওয়ার যন্ত্রণা, জীবনের মানে বদলে যাওয়া রাতারাতি, এ কেমন জীবনে, যেখানে স্বপ্নের জগত বাস্তবের কাঁটা তারে আটকে পড়ে, এ কেমন জীবন যেখানে মানুষ যা চায় তা পায় না, যা পায় তা চায় না... অবহেলা, নির্যাতনের এমনই ছবি বুক পেয়ে সিনেমার পর্দায় এঁকে গিয়েছেন তিনি, যা আজও দর্শক মননে চাবুকের মত আঁচর দেয়। 

তখন রূপোলি পর্দায় রঙিন বিনোদন নয়, ঘটক তুলে ধরেছিলেন বাংলার এক অন্যছবি, যা দারিদ্রে, অন্ধকারে ডুবে থাকে সকলের অলক্ষ্যে। সুপ্রিয়া দেবী, যিনি উত্তর কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে তখন সাধারণের চোখে রোম্যান্সের স্বপ্ন বুনছেন, সেই অভিনেত্রীকেই মাটি টেনে ভেঙে গড়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক, মেঘে ঢাকা তারা, দর্শকেরা পেয়েছিলেন এক অন্য সুপ্রিয়া দেবীকে। শক্তিপদ রাজগুরুর মূল কাহিনী অবলম্বনে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখেন মৃণাল সেন। পঞ্চাশ দশকে কলকাতার এক বাঙালি পরিবার ঘিরে কাহিনীর আবর্তন। ১৯৪৭-এর ভারত ভাগের পর এই শরণার্থী পরিবার আশ্রয় নেয় কলকাতা শহরের প্রান্তে। আর সেখান থেকেই শুরু জীবন যুদ্ধের কাহিনি। তৎকালিন দেশভাগের কবলে পড়া আশ্রয়হীণ মানুষের এক জীবন্ত উদাহরণ নীতা ও তাঁর পরিবার। দুঃখের দৃশ্যে সানাই কিংবা সেতার নয়, শেষ অংশে চাবুককেই হাতিয়ার করেছিলেন ঘটক হৃদয়ের যন্ত্রণা ফুঁটিয়ে তুলতে। 

এর পরই আসে কোমল গান্ধার-এর প্রসঙ্গ, ছবির বিষয় হল ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর শরণার্থী সমস্যা। অবশ্য কোমলগান্ধার ছবিটিই এই চলচ্চিত্র-ত্রয়ীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা আশাবাদী ছবি। এই ছবির কেন্দ্রে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের নিবেদিতপ্রাণ ও আপোশবিহীন মানসিকতা, ঋত্বিক ঘটক তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে দেশভাগ, আদর্শবাদ, দুর্নীতি, শিল্প ও জীবনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, শিল্পের পরিধি ও শ্রেণি-সংগ্রামের বিষয়টি তুলে ধরেন। একই ছকে বাঁধা সুবর্ণরেখা ছবিটিও। 

বাংলা, বাঙালি, বাংলা ভাবধারা ছিল ঘটকের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সত্যজিৎ রায় তাঁকে উল্লেশ করে লিখে ছিলেন- ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিলেন, বাঙালি শিল্পী ছিলেন– আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটেই তাঁর সবচেয়ে বড়ো পরিচয় এবং সেইটেই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। 

ঋত্বিক ঘটক সত্যজিৎ-এর হাতে অপুর কলকাতা মুখী হেয় ওঠাটা মেনে নিতে পারেননি। আর তার সূত্র ধরেই মৃণাল সেন বলেছিলেন- 'ঋত্বিক সম্ভবত সত্যজিতের নাগরিক মননটুকু তেমনভাবে ধরতে পারেননি, পারলে বোধহয় মানিকবাবুর ছবিতে অপুর বদলটা মেনে নিতে পারতেন।' আর এখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তাঁরও শেকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণাটা অনেকেই হয়তো দেখে উঠতে পারেননি। এই আক্ষেপই বুকে নিয়ে সারা জীবন সমাজের মানসিকতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন ঘটকবাবু।