সেই সময় বলিউড শাসন করছেন কিশোর কুমার। সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণী কণ্ঠ যেশুদাশের সুরের পরশে অনেকেই মেতেছিলেন। তারপরে এলেন এসপি বালাসুব্রমণিয়ম ওরফে বালু। বলিউডে বালুর অভিষেক ১৯৭৭ সালে ‘মিঠি মিঠি বাতেঁ’ ছবিতে, ‘দিল দিওয়ানা বড়া মাস্তানা’ গানে। তবে এসপি-র মায়াবি কণ্ঠস্বর যেন বলিউড থেকে হারিয়ে গেল। বেশ কয়েক বছর আর শোনা যায়নি। বলিউডে বালু ফিরলেন ১৯৮১ সালে কমল হাসান ও রতি অগ্নিহোত্রী অভিনীত সুপার ডুপার হিট ছবি ‘এক দুজেকে লিয়ে’র হাত ধরে। ‘এক দুজে কে লিয়ে’ ছবিতে গান গেয়ে আবার জাতীয় পুরস্কারে সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পুরস্কৃত হলেন এসপি বালাসুব্রমণিয়ম। আটের দশকের শেষ থেকে নয়ের দশক জুড়ে বলিউড টলিউডে গমগম করছেন অমিত কুমার, কুমার শানু। তবে মনে হত ওঁরা যেন গান গাইছেন কিশোরকুমারকে মনে করে। শ্রোতারা ভাবতেন অনেকটা কিশোরের অনুসরণ করা কণ্ঠের স্পর্ষ। ঠিক ওই সময়েই বলিউডে হাজির হলেন এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম। কিশোর কুমারের কন্ঠের গাম্ভীর্য আর মহম্মদ রফির সুরেলা কন্ঠের মেলবন্ধনে যা ঘটতে পারে সেই আশ্চর্য অনুভূতি নিয়ে এসপি বালাসুব্রমণিয়ম ওরফে বালু। 

বাংলা গানের শ্রোতাদেরও মন জয় করলেন বালু। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়টাতেও বাংলা গানের স্বপ্নালু রঙিন দিন সামান্য হলেও ছিল। সিঙ্গল স্ক্রিনের রমরমা বাড়তে  বলিউডের হাওয়া বাংলা ছবিতেও ঢুকে পড়ল। তবু বাংলার আত্মাকে টিকিয়ে রাখল বাংলা গান। পুজো প্যান্ডেলের মাইক থেকে তখনও কিছু গান ভেসে আসত।ভিসিআর-এর যুগে ‘একান্ত আপন’ ছবিতে আশা ভোঁসলের পঞ্চমী সুরে গাওয়া ডুয়েট বাংলা গান ‘না না না কাছে এসো না’-তে নতুন মাত্রা যোগ করল বালুর কণ্ঠ। শ্রীপতি পণ্ডিতারাধ্যলা বালাসুব্রমণিয়ম গানের শুরু এর অনেক আগে।সঙ্গীত দুনিয়ায় কাজ করেছেন পঞ্চাশ বছরের বেশি সময়। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময় বিভিন্ন সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জয়ীও হতেন। সিনেমায় নেপথ্য গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া তেলুগু ছবু ‘শ্রী শ্রী মর্যাদা রামান্না’-তে। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কখনও। তেলুগুর পাশাপাশি তামিল, কন্নড়, মালয়ালম, হিন্দি সিনেমায় সমানতালে গান গেয়ে গিয়েছেন। ‘কেলাডি কানমনি’, ‘থিরুডা থিরুডা’, ‘কাধালন’, ‘উল্লাসম’-এর মতো ছবিতে তাঁর গান চিরস্মরণীয়। 

 

 

কোনও ভাষা ও গানের ধারা কখনও এস পি বালাসুব্রহ্মণ্যমের গানের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। দক্ষিণ ভারতের পাশাপাশি বলিউডি ছবিতে একাধিক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। এমজিআর, শিবাজি গণেশান, রজনীকান্ত, কমল হাসান, সলমন খান থেকে শুরু করে অসংখ্য অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। অনুরাগারী তাঁকে পাদুম নীলা উপাধি দিয়েছিলেন। সালমান খানের বলিউডে উত্থান মূলত এস পির হাত ধরেই। ১৯৮৯ সালে ‘ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’ ছবির মাধ্যমে নায়ক হিসেবে বলিউডে আত্মপ্রকাশ সালমানের। একমাত্র ‘আয়া মৌসম দোস্তি কা’ ছাড়া ছবিতে সালমানের গলায় সব কটি গানই বালাসুব্রমণিয়ম গাওয়া, যার মধ্যে ‘আতে যাতে’, ‘দিল দিওয়ানা’ এবং ‘মেরে রঙ্গ মে’র মতো সুপারহিট হয়েছিল। এরপর ১৯৯১ সালেই ‘পাত্থর কে ফুল’ ছবিতে সালমানের হয়ে সাতটি গানে গলা দেন বালাসুব্রমণিয়ম। এর মধ্যে ‘কভি তু ছালিয়া লগতা হ্যায়’ এবং ‘তুমসে জো দেখতে হি প্যায়ার হুয়া’ গান দুটি সুপারহিট হয়। ওই বছরই 'সাজন' ছবিতে এস পির গলায় গাওয়া ‘বহুত প্যায়ার করতে হ্যায়’, ‘তুমসে মিলনে কি তমন্না হ্যায়’, ‘পহেলি বার মিলে হ্যায়’ আজও শ্রোতাদের মনে রয়ে গিয়েছে। পড়ে অবশ্য বিশেষ কারণে ভেঙে গিয়েছিল সলমন-এসপি জুটি।

বলিউডে তাঁর সিনেমার তালিকায় রয়েছে ‘ক্রিমিনাল’, ‘ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’, ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’, ‘রোজা’–র মতো ছবি। গানের পাশাপাশি অভিনেতা হিসেবেও দর্শকদের মন ছুঁয়ে গিয়েছেন এস পি। পেয়েছেন পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ খেতাব। ছ’‌বার জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি। অন্তত ১৬টি ভাষায় গেয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার গান। এআর রহমানের সঙ্গেও কাজ করেছেন বালাসুব্রমণিয়ম। পাঁচ দশকের সুরেলা কেরিয়ারে শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসাবে ছ’বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।গানের পাশাপাশি অভিনয় দিয়েও তিনি ভক্তদের মন জয় করেছিলেন। পাশাপাশি বহু ছবিতে তাঁর অভিনয় দক্ষতা ফুটে উঠেছিল।এক দিনে ২১টি গান রেকর্ড করার কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। সব মিলিয়ে ভারতীয় সিনেমা সঙ্গীতের মেলোডির ঝংকারে তিনি ভাস্বর হয়ে থাকবেন।