৮ জানুয়ারি আর্থ রোটেশন ডে পালিত হয়, যা পৃথিবীর ঘূর্ণনের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। এই নিবন্ধে লিওঁ ফুকোর ঐতিহাসিক পরীক্ষা, ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট দিন-রাত ও জলবায়ু এবং পৃথিবী ঘোরা বন্ধ করলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে, সেই সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

 আমরা প্রতিদিন সূর্যকে উঠতে এবং ডুবতে দেখি, দিন থেকে রাত এবং রাত থেকে দিনের যাত্রা করি। এই সবকিছু আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক মনে হয় যে আমরা হয়তো কখনো ভাবি না এর পেছনের আসল কারণটা কী। প্রতি বছর ৮ জানুয়ারি পালিত হওয়া আর্থ রোটেশন ডে এই সাধারণ দেখতে অসাধারণ সত্যটিকেই মনে করিয়ে দেয়। আর্থ রোটেশন ডে ২০২৬ (পৃথিবী ঘূর্ণন দিবস) আমাদের এটা বোঝার সুযোগ করে দেয় যে পৃথিবীর নিজের অক্ষের উপর ঘোরা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, বরং আমাদের পুরো জীবনযাত্রার ভিত্তি।

যখন পৃথিবীর ঘোরা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে

আজ বিজ্ঞান এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে পৃথিবী ক্রমাগত তার অক্ষের উপর ঘুরছে, কিন্তু একটা সময় ছিল যখন মানুষ এটা মানতে রাজি ছিল না। শত শত বছর ধরে এই ধারণা প্রচলিত ছিল যে পৃথিবী স্থির এবং সূর্য-চাঁদ তার চারপাশে ঘোরে। গ্রিক দার্শনিকরা প্রথম এই ধারণা দেন যে পৃথিবী নিজেও গতিশীল। যদিও, তাদের কাছে এটি প্রমাণ করার মতো প্রযুক্তি ছিল না। এই ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরে কেবল চিন্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যতক্ষণ না ১৯ শতকে বিজ্ঞান প্রমাণ পেশ করে।

একটি পেন্ডুলাম যা বিশ্বের চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছিল

৮ জানুয়ারী ১৮৫১ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লিওঁ ফুকো এমন একটি পরীক্ষা করেন, যা পৃথিবীর ঘূর্ণন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তিনি একটি বিশাল পেন্ডুলামের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে পৃথিবী তার অক্ষের উপর ঘুরছে। এই পরীক্ষাটি এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে পরে এটি জনসাধারণের জন্য বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষও এটি দেখে বুঝতে পারে। ফুকোর এই পরীক্ষা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে।

পৃথিবীর ঘূর্ণন: শুধু দিন-রাতের চেয়েও বেশি কিছু

পৃথিবীর ঘোরা শুধু দিন এবং রাত তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের জলবায়ু, আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পৃথিবী প্রতি ২৪ ঘন্টায় একটি চক্কর পূর্ণ করে। এই ঘূর্ণনই বাতাসের দিক নির্ধারণ করে। সামুদ্রিক স্রোত এই কারণেই বিভিন্ন পথে প্রবাহিত হয়। পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে সৃষ্ট কোরিয়োলিস প্রভাবই নির্ধারণ করে যে ঘূর্ণিঝড় কোন দিকে ঘুরবে এবং বাতাস কোন দিকে বইবে।

যদি পৃথিবী ঘোরা বন্ধ করে দেয়?

আর্থ রোটেশন ডে ২০২৬-এ এই প্রশ্নটিও নিজেকে করা জরুরি, যদি পৃথিবী ঘোরা বন্ধ করে দেয় তাহলে কী হবে? বিজ্ঞানীদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে একদিকে একটানা দিন এবং অন্যদিকে সবসময় রাত থাকবে। তাপমাত্রায় ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে এবং জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, পৃথিবীর ঘোরা জীবনের জন্য ঠিক ততটাই জরুরি যতটা বাতাস এবং জল।

আর্থ রোটেশন ডে ২০২৬-এর তাৎপর্য

এই দিনটি আমাদের বিজ্ঞানের শক্তি এবং মানুষের জিজ্ঞাসার কথা মনে করিয়ে দেয়। শিশু এবং তরুণদের জন্য এটি বোঝার একটি সুযোগ যে প্রশ্ন করা এবং যুক্তি দিয়ে ভাবা কীভাবে নতুন আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়। আর্থ রোটেশন ডে ২০২৬ শুধু একটি মহাজাগতিক ঘটনার উৎসব নয়, বরং এটি সেই চিন্তার প্রতি সম্মান যা মানুষকে ব্রহ্মাণ্ড বোঝার ক্ষমতা দিয়েছে।

পৃথিবীর গতি সম্পর্কিত কিছু চমকপ্রদ তথ্য

  • সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ধীর হচ্ছে, তাই দিনের দৈর্ঘ্য খুব ধীরে ধীরে বাড়ছে।
  • পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র, যা আমাদের সৌর বিকিরণ থেকে রক্ষা করে, এটি অভ্যন্তরীণ ঘূর্ণন এবং কোরের কার্যকলাপের সাথে যুক্ত।
  • পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় ৭০ শতাংশ অংশ জল দিয়ে ঢাকা এবং এই ভারসাম্যও গ্রহের ঘূর্ণনের সাথে যুক্ত।
  • বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর এবং এই সময়ে এর ঘূর্ণন কখনও থামেনি।
  • আর্থ রোটেশন ডে ২০২৬ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছি, তা প্রতি মুহূর্তে গতিশীল। সম্ভবত এই গতিই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, যা ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।