ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাঁর দু'টি গর্বের বিষয় ছিল পাহাড় এবং জঙ্গলমহল। পাহাড় এবং জঙ্গলমহল হাসছে বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি নিয়ে বিরোধীরা কটাক্ষ কম করেনি। প্রশাসনিক দিক খতিয়ে দেখতে গত আট বছরে বার বার ছুটে গিয়েছেন উত্তরবঙ্গে। জঙ্গলমহলকে শান্ত করা নিয়েও দল বা সরকারের প্রচারে কম সময় ব্যয় করেননি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। উত্তরবঙ্গে প্রশাসনিক কাজের সুবিধের জন্য তৈরি করেছেন উত্তরকন্যা।

কিন্তু ভোটের ফল বেরোতে দেখা যাচ্ছে, পাহাড় এবং জঙ্গলমহলই সবথেকে হতাশ করেছে তৃণমূল নেত্রীকে। জঙ্গলমহলে তবু ঘাটাল এসেছে তৃণমূলের দখলে। উত্তরবঙ্গে কিন্তু দাঁত ফোটাতে পারেনি জোড়া ফুল।

আশঙ্কাটা যে একেবারে ছিল না, তা নয়। দার্জিলিং বরাবরই তৃণমূলের কঠিন গাঁট। এবার সেখানে বিনয় তামাং গোষ্ঠীর সমর্থন পেয়েও বিপুল ব্যবধানে হারতে হয়েছে তৃণমূলকে। অন্যদিকে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ারের মতো যে কেন্দ্রগুলিতে বিজেপি-র সঙ্গে কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা  ছিল, সেগুলিতেও হারতে হয়েছে তৃণমূলকে। এমন কী জলপাইগুড়ির মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিও এবার ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। রায়গঞ্জ আসন বামেদের থেকে কেড়ে নিয়েছে বিজেপি। বালুরঘাট, মালদহ উত্তরেও ফুটেছে পদ্মফুল। শেষ মুহূর্তে মালদহ দক্ষিণ জিতে গনি খানের গড়ে কিছুটা মুখরক্ষা করেছে কংগ্রেস। কিন্তু তৃণমূলের প্রাপ্তি কিছুই নেই।  সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের প্রাপ্তি শূন্য। একমাত্র উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর উপনির্বাচনে জিতেছেন তৃণমূল প্রার্থী।

আবার জঙ্গলমহলে মাওবাদী দমন ছিল মমতা সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য। জঙ্গলমহলে যে বিজেপি সংগঠনকে শক্তিশালী করে ফেলেছে, পঞ্চায়েত ভোটেই সেই আভাস পাওয়া গিয়েছিল। লোকসভা ভোটে দেখা গেল, কার্যত গেরুয়া ঝড় উঠেছে জঙ্গলমহলে। এক ঘাটাল ছাড়া জঙ্গলমহলের পাঁচটি আসনই দখল করেছে বিজেপি। ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বিষ্ণপুর, দিন যত গড়িয়েছে জঙ্গলমহলে তত হতাশা বেড়েছে শাসক দলের সমর্থকদের। জঙ্গলমহল আর উত্তরবঙ্গের এই ফল তৃণমূলের বিপর্যয়ের বড় কারণ। দু' বছর পরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যা মমতা এবং তৃণমূলের চিন্তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। 

স্বভাবতই মমতার হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে তাঁকে বিঁধেছেন হুগলি থেকে বিজেপি-র জয়ী প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায়। লকেটের কথায়, "সিঙ্গুর নিয়েও এবার মমতার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ পুড়বে।"