Dhurandhar 2 Movie Review: অনবদ্য অভিনয় এবং গল্পের বুনন আপনাকে হলের সিট ছেড়ে নড়তে দেবে না। ছবিতে প্রত্যেকে যথাযথ এবং দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ ছবিটি গত কয়েক বছরের মধ্যে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্পাই অ্যাকশন থ্রিলার হিসেবে গণ্য হবে।
রেটিং: ৪.৫/৫
কাস্ট: রণবীর সিং, সঞ্জয় দত্ত, রাকেশ বেদী, আর মাধবন, অর্জুন রামপাল, সারা অর্জুন, গৌরব গেরা, দানিশ পান্ডোর
পরিচালনা, গল্প, চিত্রনাট্য: আদিত্য ধর
খুব কম ছবিই আমাকে সিনেমা হলের সিটে আষ্টেপৃষ্ঠে বসিয়ে রাখতে পারে। বিশেষ করে যখন ছবির দৈর্ঘ্য হয় ৩ ঘণ্টা ৪৯ মিনিটের মতো বিরাট, তখন একজন সমালোচক হিসেবে কিছুটা সন্দিহান হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আদিত্য ধর পরিচালিত ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ (Dhurandhar The Revenge) দেখার পর আমি নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি, এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। ভাবখানা এমন হবে, কী হেরিলাম এ কী সত্য! ছবিটি দেখার পর কোথাও মনে হবে না গল্প ঝুলে গেল বা কোথাও বেমানান লাগছে।
ছবিটি গত কয়েক বছরের মধ্যে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্পাই অ্যাকশন থ্রিলার হিসেবে গণ্য হবে। পরিচালক আদিত্য ধরকে ধন্যবাদ জানাতে হয়, কারণ মাত্র ৩ মাসের মধ্যে তিনি সিক্যুয়েল নিয়ে হাজির করেছেন উন্মুখ হয়ে থাকা দর্শকদের সামনে। আর রণবীর সিংকেও বিশেষ ধন্যবাদ, কারণ তিনি ওভার দ্য টপ অভিনয় করার চেষ্টাই করেননি। সে কারণেই এত গ্রহণযোগ্য হয়েছে ছবিটি।
গল্পের বুনন ও পরিচালনা: বাস্তব আর কল্পনার এক অপূর্ব মিশেল
পরিচালক আদিত্য ধর তাঁর ‘উরি’ ছবির মাধ্যমেই প্রমাণ করেছিলেন যে ডিটেলিং বা খুঁটিনাটি বিষয়ের ওপর তাঁর দখল কতটা গভীর। ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’-এ তিনি সেই পারদর্শিতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ছবির প্রেক্ষাপট বিশাল, যা প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময়কালকে কভার করে। ২০০১ সালের বিমান হাইজ্যাক থেকে শুরু করে সংসদ ভবনে হামলা, ২৬/১১-এর মুম্বই হামলা, প্রতিটি ঘটনাকে ছবির চিত্রনাট্যের সঙ্গে এমনভাবে বুনে দেওয়া হয়েছে যে দর্শক হিসেবে আপনি সেই যন্ত্রণার সঙ্গে একাত্ম হতে বাধ্য হবেন।
ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে করাচির অপরাধ জগতের অন্ধকার গলি এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের অর্থায়নকে কেন্দ্র করে। হামজা আলি মাজারি (রণবীর সিং) কীভাবে করাচির অপরাধ সিন্ডিকেটে অনুপ্রবেশ করে এবং ভেতর থেকে সেই বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে, তাই নিয়েই এই টানটান উত্তেজনাপূর্ণ চিত্রনাট্য। আদিত্য ধর অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে বাস্তবের বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা যেমন নোটবন্দী (Demonetization) এবং সন্ত্রাসবাদী অর্থায়নের ওপর তার প্রভাবকে ছবির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে অজয় সান্যালের (আর মাধবন) ‘অপারেশন গ্রিনলিফ’ এবং সেই সূত্রে পাকিস্তানে জাল নোটের কারবারিদের মাথায় হাত পড়ার দৃশ্যটি যেমন বুদ্ধিদীপ্ত তেমনি সন্তোষজনক।
রণবীর সিং: অভিনয়ের এক নতুন শিখর
এই ছবির প্রাণভোমরা হলেন রণবীর সিং। জসকিরত সিং রাঙ্গি থেকে হামজা আলি মাজারি হয়ে ওঠার এই যে রূপান্তর, তা রণবীর ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। এর আগে আমরা তাঁকে খিলজির চরিত্রে লম্বা চুলে দাপট দেখাতে দেখেছি, কিন্তু এখানে তাঁর অভিনয় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত এবং বেশিরভাগ চোখের মাধ্যমে। তাঁর সেই হিমশীতল দৃষ্টি এবং অবিচল উপস্থিতি দর্শকদের মোহিত করে রাখে। এটি কেবল অ্যাকশন হিরোর ইমেজ নয়, বরং চরিত্রের ভেতরের মানসিক লড়াই এবং যন্ত্রণাকে তিনি যেভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আমার মতে তাঁর কেরিয়ারের শ্রেষ্ঠ কাজ।
পার্শ্ব চরিত্রদের বলিষ্ঠ উপস্থিতি
ছবিটি একটি এনসেম্বল কাস্টের ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রত্যেকেই নিজেদের সেরাটা দিয়েছেন। সঞ্জয় দত্ত এসপি চৌধুরী আসলামের চরিত্রে তাঁর নিজস্ব মেজাজে ধরা দিয়েছেন। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং পর্দার উপস্থিতি এক অদ্ভুত আতঙ্ক ও রসবোধের জন্ম দেয়। আর মাধবন অজয় সান্যাল হিসেবে স্বল্প উপস্থিতিতেও নিজের ছাপ রেখে গেছেন। খলনায়কের ভূমিকায় অর্জুন রামপাল অর্থাৎ মেজর ইকবাল অত্যন্ত ধুরন্ধর এবং নিষ্ঠুর, যা ছবির উত্তেজনাকে বজায় রাখে। রণবীর বাদে এই ছবির ধুরন্ধর তিনিই। তবে অক্ষয় খান্নার অভাব কিছুটা হলেও অনুভূত হয়, কারণ তাঁর রহমান বালোচ চরিত্রটি প্রথম পর্বে যে উচ্চতা তৈরি করেছিল, তা টপকানো কঠিন।

রাকেশ বেদী একজন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদের ভূমিকায় যথাযথ, যা আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার এক নগ্ন প্রতিফলন। অন্যদিকে, দানিশ পান্ডোর এবং গৌরব গেরা তাঁদের ছোট ছোট চরিত্রে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। সারা অর্জুন অর্থাৎ ইয়ালিনা চরিত্রটি ছবির আবেগঘন দিকটিকে পুষ্ট করেছে, যদিও তাঁর স্ক্রিন টাইম আরও কিছুটা বেশি হতে পারত।
সিনেমাটোগ্রাফি এবং মিউজিক
বিকাশ নওলাখার সিনেমাটোগ্রাফি এই ছবির অন্যতম সম্পদ। করাচির ধুলোবালি মাখা গলি থেকে শুরু করে পাঞ্জাবের ড্রাগ মাফিয়াদের আস্তানা, প্রতিটি ফ্রেম যেন কথা বলে। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে অহেতুক সিজিআই-এর চেয়ে বাস্তবসম্মত স্টান্টের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা পরিচালক আদিত্য ধরের সিগনেচার স্টাইল।

শাশ্বত সচদেবের সঙ্গীত এবং ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ছবির প্রতিটি উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তকে আরও জোরালো করেছে। প্রথম পার্টের মতো এই সিনেমাতেও পুরনো হিন্দি ছবির গানকে অসম্ভব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘আরি আরি’ গানটির ব্যবহার বা গানের কথা ছবির গ্রিটি এবং ডার্ক মেজাজের সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। বিশেষ করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা ছবির দীর্ঘ রানটাইমকে এক মুহূর্তের জন্যও একঘেয়ে হতে দেয় না।
সম্পাদনা এবং রানটাইম: দীর্ঘ হলেও রুদ্ধশ্বাস
৩ ঘণ্টা ৪৯ মিনিটের ছবি মানেই অনেক সময় দর্শক ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু সম্পাদক শিবকুমার ভি পানিকর এখানে জাদুর ছোঁয়া লাগিয়েছেন। ছবির চ্যাপ্টারওয়াইজ বিন্যাস এবং নন-লিনিয়ার স্টোরিটেলিং দর্শককে সারাক্ষণ ভাবিয়ে রাখে। ছবিটি দীর্ঘ হওয়া সত্ত্বেও এর গতি কোথাও শ্লথ মনে হয়নি। বরং প্রতিটি দৃশ্যই কাহিনীর পরবর্তী মোড় নিতে সাহায্য করেছে। CBFC থেকে ছবিটি (A) সার্টিফিকেট পেলেও এর হিংস্রতা বা ভাষা চরিত্রের দাবি মেনেই এসেছে, অহেতুক মনে হয়নি।
‘বড়ে সাহাব’ এবং অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স
বড়ে সাহাব যদি ছবির ক্লাইম্যাক্স হয়ে থাকে, তবে ছবির অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স ছবির শেষ ১৫ মিনিট। আপনি বিশ্বাসই করতে পারবেন না, আপনি এতক্ষণ যা দেখলেন তার মধ্যে এত টুইস্ট থাকতে পারে। যদি ক্রিস্টোফার নোলানের 'ইনসেপশন' ছবিটি দেখে থাকেন তবে বুঝবেন, পেঁয়াজের কোয়ার মতো এত পরতে পরতে গল্পের বুনন থাকতে পারে যে দর্শক দিশেহারা হয়ে যান মাঝেমাঝে। সিনেমার শেষ ১৫ মিনিট সেই অনুভূতি দেবে দর্শকদের।
উপসংহার: কেন দেখবেন এই ছবি?
পরিশেষে এটাই বলব, ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ কেবল একটি বাণিজ্যিক ছবি নয়, এটি আধুনিক ভারতের এক সাহসী সিনেম্যাটিক বয়ান। এটি এমন একটি ছবি যা আপনাকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করবে, উত্তেজিত করবে এবং শেষ পর্যন্ত হল থেকে বেরোনোর সময় এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে যাবে। আদিত্য ধর প্রমাণ করে দিলেন যে কেন তাঁকে এই প্রজন্মের অন্যতম মেধাবী পরিচালক বলা হয়।
যাঁরা বাস্তবধর্মী স্পাই থ্রিলার পছন্দ করেন এবং বড় পর্দায় এক মহাকাব্যিক যুদ্ধের সাক্ষী হতে চান, তাঁদের জন্য এই ছবি মাস্ট-ওয়াচ। রণবীর সিংয়ের সেই দুর্ধর্ষ এন্ট্রি আর ক্লাইম্যাক্সের চমক দেখার জন্য আপনাকে সিনেমা হলে যেতেই হবে। তবে মনে রাখবেন, শেষ দৃশ্যটি মিস করবেন না, কারণ সেখানেই লুকিয়ে আছে পরবর্তী বড় চমকের ইঙ্গিত।
এই উইক এন্ডে নিখাদ বিনোদন এবং ভরপুর থ্রিল অ্যাকশনের স্বাদ পেতে সিনেমাহলে যেতে পারেন। যাঁরা ক্রাইম থ্রিলার এবং স্পাই থ্রিলার পছন্দ করেন, তাঁরা অবশ্যই যান। তবে একদম শেষে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ, যদি রক্ত দেখে গা গুলোয়, তবে এই সিনেমা আপনার জন্য নয়। না হলে উপায় চোখ বন্ধ করে থাকা।


