‘প্রতিটি অভিব্যক্তিতে সহমর্মিতা’ এই মূল ভাবনাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উৎসবে আঠারোটি বিদ্যালয় অংশগ্রহণ করে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্ল্যাম পোয়েট্রি, বিতর্ক এবং নৃত্যসহ বিভিন্ন সৃজনশীল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধকে তুলে ধরা হয়।
স্বর্ণিম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের গৌরবময় দশবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হল আন্তঃবিদ্যালয় উৎসব ‘স্বর্ণোৎসব’। দুই দিনের এই উৎসব এক অনন্য বৌদ্ধিক ও সৃজনশীল মিলনমেলায় পরিণত হয়। আঠারোটি বিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ করেছিল।
‘প্রতিটি অভিব্যক্তিতে সহমর্মিতা’—এই মূল ভাবনাকে কেন্দ্র করে স্বর্ণোৎসবের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রচলিত প্রতিযোগিতার গণ্ডি অতিক্রম করে শিক্ষার্থীদের এক ভিন্ন পরিসর প্রদান করাই ছিল এই উৎসবের উদ্দেশ্য, যেখানে তারা মৌলিকতা, সংবেদনশীলতা ও মানবিক বোধের আলোকে নিজেদের ভাবনাকে প্রকাশ করার সুযোগ পাবে।
উৎসবের প্রথম দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘এআই পজিটিভ’, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃজনশীল প্রয়োগকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ‘অভিব্যক্তি’ শীর্ষক স্ল্যাম পোয়েট্রিতে শিক্ষার্থীরা কবিতার মাধ্যমে সহমর্মিতার নানা দিক তুলে ধরে। ‘কলাকৃতি’ প্রতিযোগিতায় রঙ ও তুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠে অংশগ্রহণকারীদের শিল্পসত্তা, আর ‘দ্য ডেভিলস অ্যাডভোকেট চ্যালেঞ্জ’-এ তারা প্রচলিত ও স্বীকৃত ধারণাগুলিকে যুক্তির নিরিখে নতুনভাবে মূল্যায়নের চেষ্টা করে।
দ্বিতীয় দিনের প্রতিযোগিতাগুলির মধ্যে ছিল ‘প্রতিবিম্ব’, যেখানে সহমর্মিতা ও মানবিকতার আলোকে কলকাতার নতুন রূপ কল্পনা করে শিক্ষার্থীরা মডেল নির্মাণ করে। ছোটদের জন্য ছিল ‘কাইন্ডনেস বিগিনস উইথ মি’। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় ‘কুইজ উইজ’, ‘দ্য ডায়ালেকটিক - ডিবেট’, ‘তরঙ্গ এবং ‘মুদ্রা’।
প্রতিটি প্রতিযোগিতাই এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছিল, যাতে অংশগ্রহণকারীদের কেবল পারদর্শিতাই নয়, তাদের সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরীক্ষা হয়। ‘তরঙ্গ’-এ প্রতিযোগীদের স্বরচিত ও স্ব-সুরারোপিত গান পরিবেশন করতে হয়, আর ‘মুদ্রা’-তে শুধুমাত্র বাদ্যযন্ত্রের সুরের মাধ্যমে ‘অদৃশ্য শিশু’ বিষয়টিকে নৃত্যের ভাষায় উপস্থাপন করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়।
‘সহমর্মিতা কি শিক্ষাগত উৎকর্ষতার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ?’—এই বিতর্কের বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বহুমাত্রিক আলোচনার জন্ম দেয়। ব্যক্তি ও সমাজ—উভয় ক্ষেত্রেই কোন মূল্যবোধ অধিক তাৎপর্যপূর্ণ, তা নিয়ে উঠে আসে নানান যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি।
নাটশেল জি.কে.-এর সহযোগিতায় আয়োজিত ‘কুইজ উইজ’ প্রতিযোগিতা অডিটোরিয়ামে সৃষ্টি করে এক প্রাণবন্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিবেশ। এদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী শ্রীমতী তনুশ্রী শঙ্কর। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা এবং প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েও একে অপরের কাছ থেকে শেখার গুরুত্ব সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। তাঁর বার্তা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘তুমি যা-ই করো না কেন, নিজের বিশ্বাসে অটল থেকো এবং হৃদয়ের নির্দেশ অনুসরণ করো।’
তনুশ্রী শঙ্কর তাঁর দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নবীন প্রতিভাদের বিকাশে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। একই সঙ্গে তাঁর সমাজমনস্ক নৃত্যনাট্যগুলি সমকালীন নানা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে। দুই দিনের এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত ছিল অংশগ্রহণকারীদের সৃজনশীল সম্পৃক্ততা এবং তাদের মধ্যে জন্ম নেওয়া চিন্তাশীল আলোচনায়। শিক্ষার্থীরা কেবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেনি, তারা প্রশ্ন তুলেছে, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অন্বেষণ করেছে, সৃজনশীলতার নতুন ভাষা নির্মাণ করেছে এবং নিজেদের সীমানার বাইরে গিয়ে অন্যের ভাবনাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে।
স্বর্ণিম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের আগামী দশকের যাত্রাপথে ‘স্বর্ণোৎসব’ নিঃসন্দেহে এক তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা। এমন একটি উৎসব, যা উৎকর্ষতাকে আরও মননশীল, সৃজনশীলতাকে আরও উদ্দেশ্যমূলক এবং প্রতিটি অভিব্যক্তিকে আরও মানবিক করে তোলার প্রত্যয় বহন করে।


