করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী শুধু মহামারি নয় অপুষ্টিরও একটি বড় সমস্যা তৈরি করেছে। এই সংকট বহু মানুষকে একধাক্কায় অপুষ্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা পুষ্টিকর ডায়েটের গুণমান এবং পরিমাণে বিপজ্জনকভাবে কমছে তা বুঝতে পারছি। আর এই অপুষ্টিজনিত সমস্যা তাঁদের মধ্যেই বেশি দেখা দেবে যারা রেড কন্টেনমেন্ট জোন বা স্বল্প কন্টেনমেন্ট জোনএর বাসিন্দারা।

এটিকে সংক্ষেপে বললে, আমরা বলতে পারি যে কোভিড প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে পুষ্টির সুরক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। এই লকডাউন বা তার পরবর্তী পরিস্থিতিতে এমন অনেকেই আছেন যারা পুষ্টিবিদের পরামর্শ, অস্ত্রোপচারের বিলম্ব, টিকাদান এগুলি এড়িয়ে চলেছেন। আর এই সমস্যা এদের স্বাস্থ্যের উপরেই সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া এই অবস্থায় ক্যান্সার, রেনাল ডিজিজ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের মতো দুর্বল রোগীদের ক্ষেত্রেও এটি একটি জটিল সময় হয়ে উঠেছে। 

বর্ষা মৌসুমের সূচনাটি এই সমস্যাকে আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি বছর অপ্রত্যাশিত বর্ষার সময়ে হওয়া রোগগুলি বিশেষ করে ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, ফলে কোভিড-এর সংক্রমণের পাশাপাশি এই রোগগুলিও বর্ষার এই সময় আরও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে তুলতে পারে। বহু সমীক্ষায় প্রমানিত হয়েছে মহামারী সম্পর্কিত রোগ বর্ষায় তার প্রভাব আরও বাড়িয়ে তোলে।

অনিয়মিত ডায়েট, কোভিড মহামারির কারণে হওয়া অর্থনৈতিক সমস্যা বেশিরভাগ পরিবারের সামগ্রিক পুষ্টিকে প্রভাবিত করেছে। পরিবারের সদস্যদের চিকিত্সা করার জন্য চিকিত্সা ব্যয়ের জন্য আর্থিক সমস্যার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে খাদ্যের বাজেট কম করতে হয়েছে বহু পরিবারকেই। এই অস্থির পরিস্থিতিতে, সর্বাধিক স্বল্প শক্তির যা ক্রয় করা হয় তা পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট এবং চিনি প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই সময় শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে এমন খাবারগুলি আর্থিক কারণেই অনেক পরিবারকে বাদ দিতে হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে, বিশেষত ডিম, দুধ, মাংস এবং ডালের মতো প্রোটিন জাতীয় খাবারগুলি। 

কোভিড১৯ সঙ্কট, স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়জনীয় খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এই বর্ষার সময় এই সঙ্কট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ আমরা জানি যে ইনফ্লুয়েঞ্জা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর মত ঘটনাগুলি অত্যন্ত বেশি ঘটে। এই রোগগুলি হজম বা ডাইজেসটিভ সিস্টেমকে দুর্বল করে তোলে। আয়ুর্বেদে প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ডায়েটেও পরিবর্তন হওয়া দরকার। তাই এই সময় খাদ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিধি গুরুত্ব বহন করে। কেবল নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর রেট দেওয়া হোম ডেলিভারি থেকে রেস্তোরাঁগুলি বেছে নিন। নিশ্চিত করুন যে যখন পার্সেলড খাবার আসবে তখন প্যাকটিতে কোনও ফুটো আছে কি না। শরীর সুস্থ রাখতে এই সময় রাস্তার পাশের খোলা স্থানের খাদ্য খাওয়া এড়িয়ে চলুন।

ঘরে তৈরি টাটকা খাবার এবং ড্রাই ফ্রুটস এর মতো নিরাপদ স্ন্যাক্স খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।  বাজার থেকে আনা সমস্ত ফল এবং শাকসব্জি ভালো করে ধুয়ে নিন। এই সময় সবুজ শাক সবজি, ফুলকপি, ব্রকোলি, বাঁধাকপি ইত্যাদির মতো শাকসবজি কেনার সময় লার্ভা এবং পোকা আছে কিনা দেখে তবেই কিনুন। পাশাপাশি মুগ ডাল, মুসুর ডাল পুষ্টিকর খাদ্য প্রতিদিনের ডায়েটে রাখুন। খাবার পাতে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ লেবু ব্যবহার করুন। আদা, রসুন, গোলমরিচ, দারুচিনি এবং হিং ভারতীয় মশলা প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তাই রান্নায় এগুলির ব্যবহার বাড়িয়ে দিন।

এছাড়া টমেটো, বেল,কাঁচা লঙ্কা, লাউ, মটরশুটি জাতীয় শাক সবজি প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া আমলকি, কাঁচি হলুন, ডালিম, কলা, লিচু, চেরি মৌসুমী সাইট্রাস ফলগুলি প্রতিদিনের ডায়েটে কিছু না কিছু অন্তর্ভুক্ত করুন। কারণ করোনা ভাইরাস ছাড়াও বর্ষায় সৃষ্ট হওয়া রোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে শরীরে সুস্থ থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আর শরীর সুস্থ রাখতে হলে নজর দিতে হবে খাদ্য ব্যবস্থার উপরেই। তাই পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন সুস্থ ও নিরাপদ থাকুন।

নাজনিন হুসেইন, প্রিন্সিপ্যাল কোওর্ডিনেটর প্রিন্সিপ্যাল নিউট্রিশন এন্ড ডায়েটিক্স ইওন