নয়াদিল্লিতে শেষ হলো ১২তম ব্রিকস সংসদীয় ফোরাম। দারিদ্র্য, সন্ত্রাসবাদ ও উন্নয়নের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জনমুখী শাসন ব্যবস্থা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এই সম্মেলনে।

ব্রিকস সম্মেলনে জোর জনমুখী উন্নয়নে

নয়াদিল্লিতে বসেছিল ১২তম ব্রিকস সংসদীয় ফোরামের আসর। মঙ্গলবার, সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে উগান্ডার সাংসদ জোয়েল সেনিওনি বলেন, দেশের উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য, সন্ত্রাসবাদ ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নেতাদের সবসময় সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। সম্মেলনের শেষ দিনে তিনি জানান, সদস্য ও সহযোগী দেশগুলোর জন্য এই ফোরাম একটা দারুণ প্ল্যাটফর্ম। এখানে সবাই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে পারে, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারে এবং জনমুখী শাসন ব্যবস্থার জন্য নতুন প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।

সংবাদসংস্থা এএনআই-কে তিনি বলেন, "উগান্ডার মতো সহযোগী দেশ এবং অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই সংসদীয় ফোরাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এখানে এসে একে অপরের থেকে শিখছি। এই সামিটের থিমটা আমার খুব ভালো লেগেছে। সংসদে আমরা যে আইন বা বাজেট পাশ করি, তার কেন্দ্রে যেন সবসময় সাধারণ মানুষ থাকে, সেটাই এই থিমের মূল কথা।"

নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানুষকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন সেনিওনি। তিনি বলেন, "আমরা জনপ্রতিনিধি। তাই আমরা যাই করি না কেন, তা যেন সাধারণ মানুষের স্বার্থেই হয়। এভাবেই একটা দেশ উন্নতি করে। যখন মানুষের কথা ভেবে কাজ করা হয়, তখনই দেশের আসল বিকাশ ঘটে।"

তিনি আরও বলেন, এই ফোরামে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়েছে, দেশে ফিরে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর কথায়, "আমরা এখানে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এবার দেশে ফিরে সেগুলো পূরণ করার দায়িত্ব আমাদেরই।"

ভারত ও উগান্ডার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

ভারত ও উগান্ডার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সেনিওনি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্ম এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে। তিনি বলেন, "ভারত আর উগান্ডার সম্পর্ক বহু পুরনো। আমাদের দেশে প্রায় ৪০ হাজার ভারতীয় থাকেন। আমাদের মধ্যে একটা দারুণ বন্ডিং রয়েছে। আমরা মিলেমিশে থাকি। অতীতে কিছু সমস্যা থাকলেও, এখন আমরা খুব ভালোভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছি।"

সেনিওনি জানান, এই ফোরামের মাধ্যমে দেশগুলো নিজেদের কাজের মূল্যায়ন করার সুযোগ পায়। তিনি বলেন, "আমরা এখানে জনমুখী হওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, পরের সামিটে হয়তো আলোচনা হবে যে আমরা সেই প্রতিশ্রুতি কতটা পালন করতে পারলাম। বন্ধুত্বের আসল মানে তো এটাই হওয়া উচিত।"

নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

বিশ্বজুড়ে চলা আর্থিক সংকট, দারিদ্র্য, সন্ত্রাসবাদ এবং প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানে নেতাদের ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দেন উগান্ডার এই সাংসদ। তিনি বলেন, "আমাদের অনেক খারাপ জিনিসের বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। দারিদ্র্য বা সন্ত্রাসবাদের মতো সমস্যাগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশগুলো লড়াই করছে। এর সমাধান মূলত নেতাদের হাতেই রয়েছে।"

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের যেন মনে হয় যে নেতারা তাঁদের ভালো চান। "নেতা হিসেবে আমাদেরই এই সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজতে হবে। সেই জন্যই জনমুখী হওয়ার এই থিমটা এত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে বুঝতে হবে যে নেতারা তাঁদের কথা ভাবছেন। এতে অনেক বড় বড় সমস্যার সমাধান সহজে হয়ে যায়," যোগ করেন তিনি।

গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হিসেবে ভারত

অন্যদিকে, ফোরামের শেষ দিনে বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ অজিত গোপছড়ে বলেন, ভারতের নেতৃত্বে ২১টি দেশ গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব করতে একজোট হয়েছে। তিনি বলেন, "ভারতের নেতৃত্বে এই ২১টি দেশ আজ গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।"

ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কথা টেনে গোপছড়ে বলেন, "পশ্চিমা দেশগুলো যেমন একসময় আমাদের দেশ শাসন করেছে, তেমনই এরা এই দেশগুলোকেও শাসন করেছে। আমরা পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাই না। কিন্তু আমাদের দেশ আজ যা করছে, গ্লোবাল সাউথের আওয়াজ যেভাবে জোরালো হচ্ছে, সেটাই ব্রিকসের বড় সাফল্য। অর্থনীতি বা সংস্কৃতির মতো নানা ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয় বাড়ছে। এই দেশগুলো একজোট হয়ে শক্তিশালী হতে চাইছে, আর তারা সত্যিই শক্তিশালী হচ্ছে।"

তিনি জানান, সদস্য দেশগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য করছে। তাঁর কথায়, "চিন, রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে আমরা এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেদের ভাবনা ও শক্তি আদানপ্রদান করছি। বিজ্ঞান, গবেষণা বা প্রযুক্তির মতো নানা ক্ষেত্রে এই দেশগুলো হাত মেলাচ্ছে এবং বিপদের দিনে একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছে।"

চিনে হতে চলা পরবর্তী সামিটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমাদের দেশের মাধ্যমে আজ গোটা বিশ্ব এই সংগঠনের শক্তি দেখতে পাচ্ছে। আমি বলব, গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করা এই ২১টি দেশ চিনে আগামী সামিট হওয়ার আগে আরও অনেকটা এগিয়ে যাবে।"

গোপছড়ে আরও বলেন, "আমাদের দেশ যেভাবে সুপারপাওয়ার হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, জিডিপি বাড়ছে, অর্থনীতির প্রসার ঘটছে এবং যুবসমাজ এগোচ্ছে—মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ব্রিকসের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে একটা কড়া বার্তা পৌঁছে গেছে।"

বিরোধীদের কড়া সমালোচনা

স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) এবং নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া জোটের র‍্যালি নিয়ে বিরোধীদের কড়া সমালোচনা করেন গোপছড়ে। তিনি বলেন, "এদের মনে কোনও দেশপ্রেম নেই, দেশের প্রতি কোনও ভালোবাসা নেই। যে দিনটায় আমাদের শিখ ভাই-বোনদের দিনের আলোয় খুন করা হয়েছিল, সেই 'কালো দিনেই' এরা ইন্ডিয়া জোটের র‍্যালি করছে। এটা ওদের বিকৃত মানসিকতারই প্রমাণ।"

র‍্যালির জায়গা নিয়েও তিনি কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, "ওরা রামলীলা ময়দানে র‍্যালি করবে, অথচ রাম মন্দিরে গিয়ে আশীর্বাদ নেবে না। কে বলেছে ওরা রামের ভক্ত? এটা তো সেই 'মুখে রাম, বগলে ছুরি'-র মতো ব্যাপার। রামলীলা ময়দানে যাবে, কিন্তু রামকে সম্মান জানাবে না।"

এসআইআর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এসআইআর নিয়ে এদের কোনও মাথাব্যথা নেই। কারণ এরাই তো আসল ভোট চোর। ভোট চুরি করেই এরা ৭০ বছর ধরে এই দেশ শাসন করেছে।"

১২তম ব্রিকস সংসদীয় ফোরামের সমাপ্তি

ভারতের ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতিত্বের অধীনে, ২৬ ও ২৭ অক্টোবর ভারতীয় সংসদে ১২তম ব্রিকস সংসদীয় ফোরামের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। 'জনমুখী উন্নয়নের জন্য সংসদকে শক্তিশালী করা' থিমের ওপর ভিত্তি করে এই সম্মেলনে সদস্য ও সহযোগী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে এআই-এর সঠিক ব্যবহার, ডিজিটাল রূপান্তর এবং বিশ্বব্যাপী শাসন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।

ব্রিকসের ১১টি সদস্য দেশ এবং ১০টি সহযোগী দেশের প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে আসেন। উগান্ডা, কিউবা, ব্রাজিল এবং রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সংসদ ভবনে স্বাগত জানান আধিকারিক ও সাংসদরা। সোমবার সকাল ১০টায় এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ভাষণ দেন ওম বিড়লা।

ভারত বর্তমানে ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে। এই ফোরাম সদস্য ও সহযোগী দেশগুলোর আইনপ্রণেতাদের নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় এবং সহযোগিতা বাড়ানোর একটা বড় সুযোগ করে দিয়েছে। রাশিয়া ও ব্রাজিল ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে উগান্ডা ও কিউবা সহযোগী দেশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে।