ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায় প্রায় দেড় কোটি বছরের পুরনো এক জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যা মায়োসিন যুগের। এই আবিষ্কারের মধ্যে হাঙ্গরের দাঁতও রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে আজকের বারিদা একসময় অগভীর সমুদ্রের নিচে ছিল। এই আবিষ্কার এই অঞ্চলের সামুদ্রিক অতীতকে তুলে ধরেছে এবং জিও-ট্যুরিজমের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায় পাওয়া দেড় কোটি বছরের পুরনো এক জীবাশ্ম এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করছে। গবেষকদের মতে, আজকের বারিদা শহর ও তার আশেপাশের এলাকা একসময় অগভীর সমুদ্রের নিচে ডুবে ছিল। এই জীবাশ্মগুলো বারিদা ফসিল বেড থেকে পাওয়া গেছে, যা কুলিয়ানা ব্লকের ডেরা থেকে শুরু করে বাদাসাহি ব্লকের প্রতাপপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। জীবাশ্মগুলি মায়োসিন যুগের, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় দেড় কোটি বছর আগের। এই যুগটি জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য পরিচিত।

গবেষকরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে আজকের বারিদা এবং তার পার্শ্ববর্তী বিশাল এলাকা একসময় অগভীর সমুদ্রের অংশ ছিল।
আবিষ্কার এবং স্থানীয় লোককথা
মহারাজা শ্রীরামচন্দ্র ভঞ্জ দেও (MSCB) বিশ্ববিদ্যালয়ের জিআইএস বিভাগের গবেষক ও অধ্যাপক ডঃ দেবব্রত নন্দী এএনআই-কে জানিয়েছেন, ছাত্রদের নিয়ে একটি ফিল্ড ভিজিটের সময় এই আবিষ্কারের সূচনা হয়। তিনি বলেন, "ছাত্রদের নিয়ে ঘুরতে গিয়েই প্রথম আমার চোখে কিছু জীবাশ্মের মতো জিনিস পড়ে। আমরা স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করি ওগুলো কী। তারা সেগুলোকে 'অসুর হাড্ড' বা 'দৈত্যের হাড়' বলে ডাকত। এরপর আমরা আরও তদন্ত করে হাঙ্গরের দাঁত ও শিরদাঁড়ার মতো বেশ কিছু জীবাশ্ম খুঁজে পাই। এর মধ্যে এমন কিছু জিনিসও রয়েছে যা আমরা এখনও শনাক্ত করতে পারিনি।"
তিনি আরও জানান যে এই আবিষ্কারের আসল গুরুত্ব বোঝার জন্য তারা জীবাশ্মবিদ এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন। ডঃ নন্দী বলেন, "এটি সম্ভবত দেড় কোটি বছর আগের, যাকে মায়োসিন যুগ বলা হয়। যদি এটা সামুদ্রিক এলাকা না হতো, তাহলে আমরা হাঙ্গরের দাঁত বা অন্য সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম পেতাম না। এই জীবাশ্মের উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে ওখানে একসময় সমুদ্র ছিল।"
প্রাচীন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের খোঁজ
গবেষকদের মতে, পাওয়া জীবাশ্মগুলির মধ্যে হাঙ্গরের দাঁত, মাছের হাড়, ঝিনুকের খোলস এবং আণুবীক্ষণিক সামুদ্রিক জীব রয়েছে। যা থেকে বোঝা যায়, সেখানে একসময় অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ছিল। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ওই জায়গায় পাওয়া মাছের জীবাশ্মের প্রায় অর্ধেকই হাঙ্গরের।
আরও গবেষণার আহ্বান
ডঃ নন্দী আজকের বারিদা থেকে সমুদ্র প্রায় ৬০ কিলোমিটার পিছিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে জলবায়ু-ভিত্তিক গবেষণার উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, "সমুদ্র কেন এতদূরে সরে গেল, তা নিয়ে সকলের গবেষণা করা উচিত। এটা কি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, নাকি অন্য কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে? আরও গবেষণা হলে আমরা অনেক নতুন তথ্য আবিষ্কার করতে পারব।"
জিও-হেরিটেজ এবং পর্যটনের সম্ভাবনা
এই এলাকার বৈজ্ঞানিক এবং পর্যটন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ডঃ নন্দী এটিকে সুরক্ষা এবং স্বীকৃতির দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তিনি যোগ করেন, "আমি বলব যে আমরা এটিকে একটি জিও-হেরিটেজ সাইট হিসাবে গড়ে তুলতে পারি বা জিও-ট্যুরিজম শুরু করতে পারি। কারণ ওড়িশায় এটাই একমাত্র জায়গা যেখানে মায়োসিন যুগের জীবাশ্ম পাওয়া যায়। যদি আমরা একটি ফসিল পার্ক তৈরি করি বা এটিকে জিও-হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করি, তাহলে আমরা পর্যটকদের কাছে এটি তুলে ধরতে পারব এবং ব্যাপক গবেষণার জন্য উৎসাহ দিতে পারব।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বারিদা ফসিল বেড একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যবাহী স্থান হয়ে উঠতে পারে, যা বিজ্ঞানীদের ওড়িশার প্রাগৈতিহাসিক অতীত জানতে সাহায্য করবে এবং একই সাথে শিক্ষা, সংরক্ষণ ও পর্যটনের প্রসারেও ভূমিকা রাখবে।


