পূর্ব লাদাখের গালওয়ান সীমান্ত হত ১৫ জুন ভাতর ও চিনা সেনারা সংঘর্ষে জডিয়ে পড়েছিল। রক্তক্ষয়ী এই সংঘর্ষে ভারতের ২০ জন সেনা জওয়ানের মৃত্য হয়। কী হয়েছিল সেই রাতে? কেনই বা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল দুই দেশের সেনারা। তাই নিয়ে চলছে জল্পনা। সেনা সূত্রের খবর সেই রাতে একবার নয় তিন তিনবার ভারতীয় ও চিনা সেনাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল। তাও আবার এক জয়গায় নয়। পৃথক পৃথক স্থানে। সেনা সূত্রের খবর সেই রাতে চিন সীমান্তের দিকে মোতায়েন ছিন নতুন একদল সৈন্য যাদের সঙ্গে ভারতীয় সেনাদের কোনও পরিচয়ই ছিল না। 


পূর্ব লাদাখ সীমান্তের গালওয়ানে ১৪ নম্বর পোস্টে সাধারণত মোতায়েন থাকে না চিনা সেনা। কিন্তু বেশ কয়েক দিন ধরেই গালওয়ানের ১৪ নম্বর পোস্টের কাছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সীমারেখার কাছে একটি নরজদারী পোস্ট তৈরি করছিল চিন। যেটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ভারত। সেটি অপসারণের জন্য চুক্তিও হয়েছিল।  এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৬ নম্বর বিহার রেজিমেন্ট। যার প্রধান ছিলেন কর্নেল সন্তোষবাবু। চিনা শিবিরটি ভেঙে দেওয়া নিয়ে তিনি এক চিনা সেনা অধিকার্তার সঙ্গে কথাও বলেছিলেন বলে সূত্রের খবর। চিনা সেনারা পোস্টটি ভেঙে দিলও ১৪ জুন রাস্তে ফের সেটি নির্মাণ করেছিল। 

১৫ জুন, সূর্য তখনও পুরোপুরি অস্ত যায়নি ঘড়ির কাঁটায় বিকেল পাঁচটা হবে। সেই সময় কর্নেল সন্তোষ বাবু ব্যক্তিগত উদ্যোগেই কয়েকজন সদস্য নিয়ে প্রকৃত সীমারেখা পেরিয়ে চিনা সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সেইমত তিনি রওনাও দেন। সূত্রের খবর সীমান্তের ওই এলাকায় ভারতীয় ও চিনা সেনাদের মধ্যে সম্পর্ক খুবই স্থিতিছিল ছিল। আর সন্তোষবাবুই ব্যক্তিগত ভাবে খুবই ঠান্ডা প্রকৃতির সেনা আধিকারিক বলে পরিচিত ছিলেন। চিনা পোস্টটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার ছুটোছুটিও করেছিলেন তিনি। তাই পরিচয় ছিল সীমান্তের ওপারে দায়িত্ব থাকা সেনা কর্মী ও আধিকারিকদের সঙ্গে। মেজর বা কর্নেল পদস্থ যে কোনও ব্যক্তি সহজেরই সীমান্ত পার হতে অন্যপক্ষের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলে যেতেই পারে। 

সন্ধ্যে ৭টার সময় সন্তোষবাবু  ৩৫ জওয়নকে নিয়ে পায়ে হেঁটেই সামান্ত পার হন।  সংঘর্ষ নয়। তিনি খোঁজ খবর নিতেই সামান্ত পার হয়েছিলেন বলে সূত্রের খবর। কিন্তু সীমান্ত পার হয়ে ভারতীয় সৈন্যরা কিছুটা আবাক হয়ে গিয়েছিল। জওয়ানরা দেখেছিল চিনারা তাদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে না। উল্টে চিনা সৈন্যরা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে কিছুটা তৎপরও ছিল। সেই সময়ই কর্নেল সন্তোষবাবু বুঝতে পেরেছিলেন কোথাও একটা ভুল হয়েছে। চিন সেনাদের মুখগুলি অপরিচিত। তখন তাঁর মনে হয়েছিল সীমান্তে নতুন একদল চিনা সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। আর তারমধ্যেই শুরু হয়ে যায়  সংঘর্ষ। সেই সময়ই উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। কর্নেলকে ধাক্কা মারে এক চিনা সৈন্য।  অপমান সহ্য করতে না পেরে পাল্টা মারদেরও উদ্যোগ নেয় ভারতীয় সেনারা। ভারতীয় সেনারা চিনা সেনার নজরদারী পোস্টটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। রাত নটা নাগাদ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।  কর্নেল সন্তোষ বাবু ফিরে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেই সময়ই একটি বড় পাথর ছুঁড়ে মারা হয় তাঁকে। তিনি গালওয়ান নদীতে পড়ে যান। 

তারপরই আবারও সংঘর্ষে জডিয় পড়ে দুই পক্ষ।  সূত্রের খবর সাইয়ক আর গালওয়ানেরে সঙ্গম স্থলেও ভারত ও চিনা সেনারা সেই দিন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল দুই দল। এই সংঘর্ষ প্রায় ৪৫ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে প্রায় ৩০০ সেনা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। ১৬ নম্বর বিহার রেজিমেন্টকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গিয়েছিল ৩ নম্বর পঞ্জাব রেজিমেন্ট। ঘণ্টাখানেক দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি চলতে থাকে। অবশেষে রাত ১১টা নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সেই সময়ই দুই পক্ষের সেনারা গালওয়ান নদীতে পড়ে থাকা মৃতদেহ উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়।  

এরপরই রাত এগারোটা থেকে আবারও শুরু হয়েছিল সংঘর্ষ। আর এই সংঘর্ষ চলে প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে। পরে সেনারা নিজেরাই রণেভঙ্গ দেয়। আর নিজেনারই মৃত ও আহত সহযোদ্ধাদের সরিয়ে নিয়ে যায়। সেই সময়ই দুই মেজর সহ ১০ ভারতীয় সেনা জওয়ানকে বন্দি করে চিন। পরে অবশ্য তাদের ছেড়ে দেয়। 

ডোকালমের সময় থেকেই ১৬ নম্বর বিহার রেজিমেন্ট সক্রিয় ছিল। দীর্ঘ দিন ধরে এই রেজিমেন্ট লাদাখে অবস্থান করছে। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পাশাপাশি চিনা সৈন্যদের সঙ্গে সুসম্পর্কও গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সেদিনের সংঘর্ষে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বলেই স্বীকার করেনিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছিন এক সেনা কর্তা।