রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিমের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লার কাছে যে বিস্ফোরণে ১১ জন নিহত হয়েছিল, তা সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদার একটি শাখা চালিয়েছিল। রিপোর্টে সংগঠনটির আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিমের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লার কাছে যে বিস্ফোরণে ১১ জন নিহত হয়েছিল, তা সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদার একটি শাখা চালিয়েছিল। রিপোর্টে সংগঠনটির আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। হামলাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে, ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (AQIS) দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে সক্রিয় রয়েছে এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন সেল (শাখা) গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।

রাষ্ট্রসংঘের পর্যবেক্ষক দল গোষ্ঠীটির লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্কের বিষয়টিও তুলে ধরেছে। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে বছরের পর বছর ধরে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী চাপের মুখেও AQIS তাদের কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও ফান্ডিং বজায় রেখেছে। লাল কেল্লার হামলাটিকে গোষ্ঠীটির নতুন করে ফিরে পাওয়া কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে যে, AQIS নতুন সেল গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে তাদের কার্যক্রমের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান উত্তেজনা

প্রতিবেদনে আলাদাভাবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত হিংসা তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। তালিবানের বিরুদ্ধে ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ (TTP)-কে সহায়তা অব্যাহত রাখার অভিযোগ রয়েছে। এই গোষ্ঠীটি পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা চালাচ্ছে মাঝে মাঝেই। হামলার এই বৃদ্ধির ফলে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়ায় 'ইত্তিহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান' (আইএমপি)-এর চালানো বিভিন্ন হামলার সঙ্গেও একিউআইএস (AQIS)-এর যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বান্নুতে একটি নিরাপত্তা চৌকির কাছে প্রাণঘাতী আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং গাড়িতে বিস্ফোরক ব্যবহার করে চালানো হামলা।

রাষ্ট্রসংঘের পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগের বিষয়টি এই মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে, একিউআইএস এখন বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলে কার্যক্রম চালানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তারা সহযোগী বা ছাতা-সংগঠনের (umbrella structures) মাধ্যমেও কাজ করতে পারে, যার ফলে তাদের কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা এবং তা প্রতিহত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার বৃদ্ধি

রাষ্ট্রসংঘের প্রতিবেদনে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ও তাদের সমর্থকদের দ্বারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। পর্যবেক্ষক দলের তথ্যমতে, বোমা তৈরি এবং লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য এসব সংগঠনের সদস্যরা চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-সহ বিভিন্ন এআই টুলের ব্যবহার বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স' (আইএসআইএল-কে বা ISIL-K) বিভিন্ন ভাষায় দ্রুত প্রচারমূলক বার্তা অনুবাদ ও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে এআই ব্যবহার করছে, যার ফলে তারা আরও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছতে পারছে।

রাষ্ট্রসংঘের পর্যবেক্ষকরা রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্রের প্রতি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর অব্যাহত আগ্রহের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। জানা গেছে, আইএসআইএল (ISIL)-এর ইংরেজি ভাষার প্রকাশনা 'ইনভেড' (Invade)-এ এ বছর বোটুলিনাম টক্সিন ও সায়ানাইড সংক্রান্ত বিষয়বস্তু প্রকাশিত হয়েছিল, যা অপ্রচলিত অস্ত্রের প্রতি গোষ্ঠীটির অব্যাহত আগ্রহকেই নির্দেশ করে।

নিষেধাজ্ঞা তালিকায় পরিবর্তন

আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রসংঘের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নতুন করে তিন ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সাতজনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল 'আল-নুসরা ফ্রন্ট'—যা 'হায়াত তাহরির আল-শাম' (এইচটিএস বা HTS) নামেও পরিচিত—তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

লাল কেল্লায় বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে একিউআইএস-এর যোগের বিষয়টি ভারতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের নভেম্বরের ওই হামলাটিকে আল-কায়েদার কর্মকাণ্ডের বৃহত্তর আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।