নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আগে সাংবাদিকদের দেওয়া মিডিয়া কিট সাড়া ফেলেছে। বিহারের ছাতু, ওড়িশার কফি থেকে শুরু করে গুজরাটের হস্তশিল্প—এই কিটের মাধ্যমে ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক।

হাই-প্রোফাইল কূটনীতির পাশাপাশি এবার আলোচনার কেন্দ্রে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব স্বাদ আর সংস্কৃতি। বিহারের একেবারে মাটির কাছাকাছি থাকা ছাতু, ওড়িশার কোরাপুট পাহাড়ের কফি আর গুজরাটের চোখধাঁধানো হস্তশিল্প—এই সবই জায়গা করে নিয়েছে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের মিডিয়া কিটে।

ব্রিকস সম্মেলনের মিডিয়া কিট

এই সপ্তাহেই ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে এই বড় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। তার আগে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা রাজধানীতে এসে পৌঁছেছেন। তাঁদের হাতে যে মিডিয়া কিট তুলে দেওয়া হয়েছে, তাতে শুধু সম্মেলনের তথ্যই নেই, রয়েছে ভারতের ঐতিহ্য, স্থানীয় জিনিসপত্র আর কারুশিল্পের এক ঝলক। এই উদ্যোগের পিছনে রয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA)। তাদের লক্ষ্য, বিভিন্ন রাজ্য থেকে আনা জিনিসপত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে ভারতের একটা ছোট্ট কিন্তু সুন্দর ছবি তুলে ধরা।

এই মিডিয়া কিটের ভাবনা এবং সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে সংবাদসংস্থা এএনআই-কে বিদেশ মন্ত্রকের ওএসডি (পিআর) বাসুদেব রবি বলেন, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল ভারতের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরা এবং যাকে তিনি "ইন্ডিয়া স্টোরি" বলছেন, সেই গল্পটা শোনানো।

রবি বলেন, "এটা আমাদের জন্য একটা বড় সুযোগ, যেখানে আমরা মিডিয়ার বন্ধুদের এবং বিদেশ থেকে আসা সাংবাদিকদের কাছে ইন্ডিয়া স্টোরি তুলে ধরতে পারি। তাই আমরা তিনটি রাজ্য সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি। আমাদের চেষ্টা ছিল ঐতিহ্যবাহী খাবারদাবার তুলে ধরার।"

এই কিটে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জিনিসপত্র খুব যত্ন করে বেছে নেওয়া হয়েছে। যেমন, বিহারের ছাতু আর মাখানা, ওড়িশার কোরাপুট কফি এবং গুজরাটের হস্তশিল্প। এককথায়, এই মিডিয়া কিটটি ভারতের আঞ্চলিক পরিচয়ের এক ছোটখাটো প্রদর্শনী হয়ে উঠেছে।

তিনি আরও বলেন, "বিহার সরকার আমাদের ঐতিহ্যবাহী পানীয় 'ছাতু' এবং বিহারের অত্যন্ত জনপ্রিয় ফসল 'মাখানা' দিয়ে সাহায্য করেছে। ওড়িশা সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমরা কোরাপুট থেকে কফি নিয়ে এসেছি। আর গুজরাট সরকার তাদের রাজ্যের দক্ষ কারিগরদের তৈরি নানা ধরনের হস্তশিল্প দিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য একটাই— ভারতকে তুলে ধরা এবং ইন্ডিয়া স্টোরি বলা।"

ভারতীয় খাবারের গুরুত্ব

ছাতু, যা মূলত পানীয় হিসেবে খাওয়া হয় এবং বিহারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা রাজ্যের খাদ্য ঐতিহ্যের প্রতীক। অন্যদিকে, মাখানা সেখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও খাদ্যপণ্যকে তুলে ধরে। কোরাপুটের কফি ওড়িশার নতুন কফি উৎপাদন ক্ষেত্রের স্বাদ দেয়, আর গুজরাটের হস্তশিল্প রাজ্যের দীর্ঘদিনের কারিগরি ঐতিহ্য এবং দক্ষতার উপর আলো ফেলে।

ভারত যখন ব্রিকস-এর সভাপতিত্ব করছে, তখন এই ধরনের উপস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত শুধু বিশ্ব অর্থনীতি বা ভূ-রাজনৈতিক বিষয় নিয়েই আলোচনা করতে চায় না, আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে নিজের বৈচিত্র্য, উদ্ভাবন এবং উন্নয়নের গল্পও তুলে ধরতে চায়। মিডিয়া কিটটি ভারতের একটি নরম, সাংস্কৃতিক দিক তুলে ধরলেও, সম্মেলনের প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে ব্যাপক সমন্বয় করা হয়েছে।

রবি জানান, গত এক বছর ধরে ভারত ব্রিকস-এর সভাপতি হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রকের নেতৃত্বে একাধিক জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজন করেছে। তিনি বলেন, "ভারত গত এক বছর ধরে ব্রিকস-এর সভাপতিত্ব করছে। আমরা বিভিন্ন জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের অধীনে নানা বৈঠক করেছি, যা ভারত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে সারা দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।"

সম্মেলনটি ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ১২ এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকস গোষ্ঠীর নেতারা একত্রিত হবেন। রবি আরও বলেন, "সম্মেলনটি ১২ ও ১৩ তারিখ দিল্লিতে হচ্ছে। এর আগেও কিছু অনুষ্ঠান রয়েছে। সব অনুষ্ঠানই ভারত মণ্ডপম কমপ্লেক্সে হবে। বিদেশ মন্ত্রকের তরফে আমাদের সহকর্মী, ভারত সরকারের অন্যান্য সংস্থা, দিল্লি পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সমন্বয় করতে হয়েছে। এটা একটা টিমওয়ার্ক। আমরা একটি সফল সম্মেলনের অপেক্ষায় আছি।"

নয়াদিল্লির সভাপতিত্বে বাণিজ্য, ডিজিটাল প্রযুক্তি, অর্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব প্রশাসনের সংস্কারের মতো বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার উপর মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। আলোচনায় স্থিতিশীল বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ইন্টিগ্রেশন, জাতীয় মুদ্রার বৃহত্তর ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (MSME) উন্নয়ন, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলি উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়াও জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, উন্নয়নমূলক অর্থায়ন, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সম্প্রসারণ এবং বহুপাক্ষিক আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের মতো বিষয়গুলিও সম্মেলনের সময় গুরুত্ব পাবে।

২০২৬ সালের এই সম্মেলনটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন ব্রিকস ১১ সদস্যের একটি সম্প্রসারিত গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করছে। এই গোষ্ঠীতে রয়েছে ব্রাজিল, চিন, মিশর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। ইন্দোনেশিয়া ২০২৫ সালে পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে।

ব্রিকস-এর বৃহত্তর কাঠামোতে ১০টি সহযোগী দেশও রয়েছে—বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান এবং ভিয়েতনাম। এরা পূর্ণ সদস্য না হলেও সহযোগী দেশ হিসেবে অংশ নেয়।

গোষ্ঠীটির কার্যকলাপ মূলত তিনটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে চলে—রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যে আদানপ্রদান।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই সম্মেলনের আয়োজন করবেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এরও যোগ দেওয়ার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।

শি জিনপিং-এর অংশগ্রহণ একটি বড় কূটনৈতিক ঘটনা হতে চলেছে। ২০১৯ সালে মামাল্লাপুরমে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পর এটিই তাঁর প্রথম ভারত সফর।

তবে এত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক, ভূ-রাজনৈতিক আলোচনা এবং দর কষাকষির মাঝেও, এই মিডিয়া কিটগুলি সফররত সাংবাদিকদের জন্য একটি শান্ত ও আন্তরিক অনুভূতি নিয়ে এসেছে—খাবার, কফি এবং কারুশিল্পের মাধ্যমে ভারতের এক ঝলক।

ছাতু ও মাখানার পরিচিত স্বাদ থেকে শুরু করে কোরাপুটের স্বতন্ত্র কফি এবং গুজরাটের হস্তশিল্পের ঐতিহ্য—এই উদ্যোগটি এমন এক 'ইন্ডিয়া স্টোরি' বলতে চায় যা শুধু নীতি নির্ধারণের টেবিল বা কূটনৈতিক করিডোরে সীমাবদ্ধ নয়।

এইভাবেই, ব্রিকস মিডিয়া কিটটি ভারতের বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক ভূমিকার সঙ্গে তার বিভিন্ন অঞ্চলের দৈনন্দিন ঐতিহ্য ও দক্ষতার মধ্যে একটি ছোট কিন্তু ইচ্ছাকৃত সেতু হয়ে উঠেছে।