দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল মোটামুটি পরিষ্কার। সামান্য কয়েকটি আসনে এখনও কয়েক রাউন্ড গণনা বাকি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফলাফল মোটামুটি পরিষ্কার, ৭০ আসনের মধ্যে আপ জিতে নিয়েছে ৬২টি আসন, আর বিজেপির জুটেছে ৮টি। কংগ্রেস পায়নি একটিও। আপ-এর এই দিল্লি জয়-কে অনেকেই শাহিনবাগের জয় বলে বর্ণনা করছেন। শাহিনবাগে দুই মাস ধরে সিএএ বিরোধী আন্দোলন চলছে। কিন্তু, নির্বাচনের এই ফলাফলে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার সিএএ প্রত্যাহার করবে কিংবা নীতিগতভাবে দিক পরিবর্তন করবে, এতটা আশা করা বাড়াবাড়ি।

২০১৯ সালে বিপুল জনাদেশ নিয়ে ফেরার পর পরবর্তী নয় মাসেই ৩৭০ ধারা বাতিল, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী, অযোধ্যায় রাম মন্দির - সহ বেশ কিছু ইস্তেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করেছে বিজেপি। তার ভিত্তিতেই দিল্লির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল বিজেপি। নিঃসন্দেহে তাতে বড় ধাক্কা খেতে হয়েছে। কিন্তু দিল্লির বিধানসভা ভোটের ফল সারা দেশের মানুষের বিজেপির নীতি নিয়ে মতামত প্রকাশ তা বলা যাবে না।

দিল্লি নিছকই একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং লোকসভা আসনের সংখ্যা মাত্র সাতটি। তার ভিত্তিতে নির্বাচনী ইস্তেহারের প্রতিশ্রুতি পালনের পথ থেকে সরে যাবে বিজেপি, এমনটা ভাবার কারণ নেই। এই সিদ্ধান্তগুলির বেশ কয়েকটি নেওয়ার পরই কিন্তু মহারাষ্ট্র নির্বাচনে সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি। শেষ পর্যন্ত সরকার গড়তে না পারলেও তারাই দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছিল। তার উপর দিল্লিতে এমন অনেক ভোটার আছেন, যাঁদের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পছন্দ অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদীকে। সেইসঙ্গে এই কথাও মনে রাখতে হবে নরেন্দ্র মোদী প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের বছরই দিল্লির ভোটে আপ ৬৭ আসন জিতেছিল। কাজেই দিল্লিতে বিজেপির খারাপ ফল, নরেন্দ্র মোদীর পরাজয়, একথা বলা যায় না।

দ্বিতীয় মেয়াদে, নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে যেসব বিতর্ক ও সংঘাতের চলে আসছে তার সবগুলির সমাধান করতে চান তিনি। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ, সিএএ পাস করার পাশাপাশি বোড়ো চুক্তি স্বাক্ষর, ত্রিপুরার ব্রু উদ্বাস্তুদের বসতি স্থাপনের মতো পদক্ষেপ সেই পথেই এসেছে। দিল্লিতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনও রোগ দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকলে তা দেহের অঙ্গ হয়ে যায়। সামাজিক জীবনেও এটিই ঘটেছে। বেশ কয়েকটি রোগের প্রভাবে দেশ দুর্বল হয়ে আছে। এই সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করতেই সব শক্তিগুলির ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এইসব রোগ তিনি সাড়িয়ে ছাড়বেন।

কাজেই দিল্লির ভোটের ফলাফলে বিরোধী শিবির এদিন যতই উৎসবের মেজাজে থাক, একে করে মোদী সরকারের উপর খুব একটা প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। সিএএ প্রত্যাহার বা এনপিআর-এনআরসি সম্পর্কে সরকারের অবস্থান পাল্টাবে না। একটা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনী পরাজয়ের কারণে নরেন্দ্র মোদী তার জাতীয় কর্মসূচী থেকে সরে আসবেন এমন সম্ভাবনা খুবই কম। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেও বিজেপি রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিসগড়ের মতো রাজ্যে বড় পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। তবুও, মাত্র কয়েক মাস পরই, একই নির্বাচনকেন্দ্রে মানুষ নরেন্দ্র মোদীকে ভোট দিয়েছিলেন। তাই দিল্লির ভোটের ফলাফল-কে শাহিনবাগের জয় বা একে নিয়ে বিরোধীদের খুব বেশি আশা না করাই ভালো।