তপন মল্লিক, দিল্লিতে শীতের ঠান্ডা যত কঠিন হচ্ছে সিঙ্ঘু সীমান্তে কৃষকদের আন্দোলনের ঝাঁজ ততই বাড়ছে। ওই ঠান্ডায় তাঁরা গত ২৭ দিন ধরে দিল্লির সীমানা অবরোধ করে বসে রয়েছেন নতুন কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে। বেসরকারি মতে কৃষক আন্দোলনে এ পর্যন্ত মারা গিয়েছেন তিরিশের বেশি কৃষক। তারপরও আন্দোলনে পড়েনি কোনও হতাশার ছায়া। এখনও কেন্দ্রের আনা কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকেরা প্রতিবাদে অনড়। 
কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষকেরা কেন্দ্রের ওপর আরও চাপ বাড়াতে আন্দোলনের ধার বাড়াতে নতুন পন্থা নেন। তারই অঙ্গ হিসেবে সোমবার থেকে শুরু হয়েছে কৃষকদের রিলে অনশন। কেবল অনশন নয়, পাশাপাশি আগামী দিনে আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে কৃষক সংগঠনগুলির তরফে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
এমনিতে একটানা চলা কৃষক আন্দোলনের জেরে অবরুদ্ধ রাজধানী, তার ওপর একাধিকবার প্রতিবাদী কৃষকদের সঙ্গে বৈঠক করেও কেন্দ্র কোনও সমাধানসূত্র বের করতে পারেনি। সোশ্যাল মিডিয়াতেও গর্জে উঠেছে কৃষকদের প্রতিবাদ। সেই ফেসবুক পেজ রবিবার রাতে আচমকা উধাও হয়ে যায়। তার পরেই শুরু হয় প্রতিবাদ। চাপের মুখে পড়ে সেই ফেসবুক পেজটি ফিরিয়ে দেয় ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। এতেও চাপ বেড়েছে কেন্দ্রের। 
সূত্র খুঁজতে মরিয়া কেন্দ্র মঙ্গলবারও আন্দোলকারীদের সঙ্গে ফের বৈঠকে বসার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কৃষকদের বক্তব্য, সংশোধন নয়, তিনটি কৃষি আইনকেই প্রত্যাহার করতে হবে সরকারকে। কেন্দ্রের তরফে নতুন করে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণে কোনও আগ্রহ নেই কৃষকদের। দিল্লি সীমানায় অবরোধকারী কৃষক সংগঠনগুলি জানিয়েছে, আলোচনা হতে পারে কিন্তু তার আগে সরকারকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব জানাতে হবে।
কৃষি মন্ত্রকের যুগ্মসচিবের চিঠির প্রেক্ষিতে কৃষকদের অভিযোগ, যুগ্মসচিবের চিঠিতে নতুন কিছু নেই। কৃষকরা আগেই জানিয়েছেন, তাঁদের একমাত্র দাবি তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার। তারা আইন সংশোধনের প্রস্তাবও আগে খারিজ করেছেন। তাই এই অবস্থায় বৈঠকে নতুন কী কথা হতে পারে? বোঝাই যাচ্ছে কেন্দ্রের আলোচনা বা অন্য কোনও প্রস্তাবে কৃষকদের মন ভোলানো যাবে না। কৃষকদের দাবি সরকারকে তিনটি কৃষি আইনই প্রত্যাহার করতে হবে। 


কেন্দ্রের ওপর চাপ বাড়াতে কৃষকদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতে আজ মঙ্গলবার মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে সিপিএমের কৃষক সভার হাজার তিনেক কৃষক গাড়ির মিছিল করে দিল্লির দিকে রওনা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আরও সাত হাজার কৃষক যোগ দেবেন নাসিকের চান্দবডে। কেন্দ্রের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে পঞ্জাবের কিসান সমিতির নেতা কাশ্মীর সিংহ বলেন, ‘সরকার আলোচনার দিন ক্ষণ জানতে চাইছে। আমরা তো দিল্লির সীমানায় বসেই রয়েছি, যাতে সরকার আমাদের কথা শোনে। সরকারের মন্ত্রী-আমলাদেরই সময় নেই। তাঁরা দিনক্ষণ ঠিক করুন। না হলে আমাদের তাঁবুতে এসে কথা বলুন। দেখে যান, কী ভাবে রয়েছি’। কৃষক সমন্বয় কমিটির তরফে হান্নান মোল্লা কৃষি মন্ত্রকের যুগ্মসচিবকে চিঠির জবাবে জানিয়েছেন, সরকার প্রথম দিন থেকেই কৃষকদের দাবি জানে। তাতে কান না-দিয়ে ছোট ছোট প্রশ্নে আলোচনা করতে চাইছে। এতে লাভ হবে না। 
ইতিমধ্যে সিংঘুতে নিরঞ্জন সিংহ নামে ৬৫ বছরের এক চাষি বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কৃষক নেতাদের দাবি, কেন্দ্রের অবস্থানের বিরুদ্ধেই তাঁর প্রতিবাদ। গত সপ্তাহে হরিয়ানার করনালের সন্ত রাম সিংহ আত্মঘাতী হয়েছিলেন এই সিংঘুতেই। রোহতকের হাসপাতাল থেকেই নিরঞ্জন বলেন, ‘সাধারণত কেউ আত্মহত্যা করতে গেলে আত্মহত্যায় যে প্ররোচিত করে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আমার ক্ষেত্রে প্ররোচিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ। তাঁদের গ্রেফতার করা হোক’। সোমবার পঞ্জাবের ফিরোজ়পুরের আরও এক কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।
এই অবস্থায় দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথমদিকে বিরোধীদের নিশানা করার পরে গত কয়েক দিন ধরে কখনও নিজের রাজ্য গুজরাতে, কখনও বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশে গিয়ে নতুন কৃষি আইন নিয়ে কথা বলছিলেন। পাশাপাশি বিজেপি এবং সরকারপক্ষ থেকেও লাগাতার প্রচার চলছে। কিন্তু তাতেও আন্দোলনের ঝাঁঝ না কমে বরং বেড়েই চলেছে। কৃষকরা তাদের আন্দোলনের ধার বাড়াতে, সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আন্দোলনে নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করছেন।