ফ্রিডম কুকিং রাইস ব্র্যান অয়েলের বিজ্ঞাপনে কোলেস্টেরল কমানোর দাবি ঘিরে বিতর্ক। এই বিভ্রান্তিকর দাবির জেরে জেমিনি এডিবলস, বিগবাস্কেট ও ফ্লিপকার্টকে নোটিশ পাঠাল এফএসএসএআই (FSSAI)।
ভারতের খাদ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই (FSSAI) সম্প্রতি বিগবাস্কেট, ফ্লিপকার্ট এবং হায়দরাবাদের জেমিনি এডিবলস অ্যান্ড ফ্যাটস ইন্ডিয়া লিমিটেডকে নোটিশ পাঠিয়েছে। 'ফ্রিডম কুকিং রাইস ব্র্যান অয়েল'-এর বিজ্ঞাপনে কোলেস্টেরল কমানো এবং হার্ট ভালো রাখার যে দাবি করা হয়েছে, তা বিভ্রান্তিকর বলে অভিযোগ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, খাদ্য সুরক্ষা নিয়ম অনুযায়ী এই ধরনের দাবি করার কোনও অনুমতি নেই।
এফএসএসএআই গত ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করে জানায়, জেমিনি এডিবলস, বিগবাস্কেটের পরিচালন সংস্থা ইনোভেটিভ রিটেল কনসেপ্টস এবং ফ্লিপকার্ট ইন্ডিয়াকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই তেলের বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছিল, এটি 'খারাপ কোলেস্টেরল কমায় এবং ভালো কোলেস্টেরল বাড়ায় বা বজায় রাখে'। পাশাপাশি '১০,০০০+ পিপিএম ন্যাচারাল ওরাইজেনল' থাকার কথাও বলা হয়েছিল।
এফএসএসএআই স্পষ্ট জানিয়েছে, ২০১৮ সালের খাদ্য সুরক্ষা ও মান (বিজ্ঞাপন ও দাবি) রেগুলেশন অনুযায়ী রাইস ব্র্যান অয়েলের ক্ষেত্রে কোলেস্টেরল বা হার্টের স্বাস্থ্য নিয়ে এমন দাবি করার কোনও আইনি বৈধতা নেই।
কিন্তু রাইস ব্র্যান অয়েল কি সত্যিই কোলেস্টেরল কমায়?
রাইস ব্র্যান অয়েল হয়তো মোট কোলেস্টেরল এবং এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল) কমাতে কিছুটা সাহায্য করে। তবে এর উপকারিতা কতটা, তা নির্ভর করে সঠিক প্রমাণ এবং নির্দিষ্ট দাবির ওপর। ২০২১ সালে আটটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ওপর করা একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, রাইস ব্র্যান অয়েল খেলে মোট কোলেস্টেরল, এলডিএল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কিছুটা কমে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বাজারে বিক্রি হওয়া যে কোনও তেলের ব্র্যান্ড খারাপ কোলেস্টেরল কমানো বা ভালো কোলেস্টেরল বাড়ানোর গ্যারান্টি দিতে পারে।
এফএসএসএআই কেন নোটিশ পাঠাল?
নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০০৬ সালের খাদ্য সুরক্ষা ও মান আইন অনুযায়ী এই তিন সংস্থার কাছে জবাব তলব করেছে, কেন তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এফএসএসএআই এর পাশাপাশি জেমিনি এডিবলসের লাইসেন্স নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ, ই-কমার্স ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ সেন্ট্রাল লাইসেন্স ছাড়াই তারা নিজেদের ওয়েবসাইটে খাবার বিক্রি করছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আপাতত সংস্থাগুলির কাছে শুধু জবাব চেয়েছে। নোটিশ পাঠানোর মানেই এই নয় যে তারা চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে।
এফএসএসএআই-এর সাম্প্রতিক অভিযান: আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
এফএসএসএআই গত ১৬ অক্টোবর দেশজুড়ে খাদ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, লাইসেন্স এবং বিজ্ঞাপনের দাবির ওপর একটি বড়সড় অভিযান চালায়। রাইস ব্র্যান অয়েলের নোটিশটি তারই একটা অংশ। এর পাশাপাশি একটি নামী হোটেল এবং আরও দুটি খাদ্য প্রস্তুতকারক সংস্থার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এফএসএসএআই পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন, স্টোরেজ এবং লাইসেন্সের নিয়মে বড়সড় গাফিলতি থাকায় ডিএনভি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের (DNV Food Products Ltd) লাইসেন্স সাসপেন্ড করেছে। এছাড়া, বারবার খাদ্য সুরক্ষার নিয়ম ভাঙার অভিযোগে ঝনভিত্তান্নি (Jhanvittanni)-র লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়াদিল্লির র্যাডিসন ব্লু (Radisson Blu) হোটেলের পরিচালন সংস্থা এবি হোটেলস লিমিটেডকেও একটি ইমপ্রুভমেন্ট নোটিশ ধরিয়েছে। পরিদর্শনের সময় সেখানে মরচে ধরা যন্ত্রপাতি, ফ্রিজার লিক হওয়া এবং রেফ্রিজারেশন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ভেন্টিলেশন ও আলোর ক্ষেত্রে একাধিক ত্রুটি ধরা পড়ে।
এই পদক্ষেপগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, শুধু বিজ্ঞাপনের ওপর নজরদারি নয়, খাবার কীভাবে মজুত করা হচ্ছে বা বিক্রি হচ্ছে, সেদিকেও কড়া নজর রাখছে এফএসএসএআই। রাইস ব্র্যান অয়েলের ক্ষেত্রে শুধু শোকজ নোটিশ দেওয়া হলেও, বাকি দুটি সংস্থার লাইসেন্স সাসপেন্ড বা বাতিল করার মতো কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গ্রাহক হিসেবে আপনার কী জানা উচিত?
আমরা অনেকেই কোলেস্টেরল কমানো বা হার্ট ভালো রাখার মতো চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে জিনিস কিনে ফেলি। কিন্তু যে কোনও প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে তার উপাদান বা ইনগ্রিডিয়েন্টস তালিকা ভালো করে পড়ে নেওয়া উচিত। শুধু বিজ্ঞাপনের চমকে না ভুলে, একটু খোঁজখবর নিয়ে তবেই সঠিক জিনিসটা বেছে নিন।
এফএসএসএআই-এর এই কড়া পদক্ষেপ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, খাদ্য প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোকে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে। জেমিনি এডিবলস, বিগবাস্কেট এবং ফ্লিপকার্টকে আপাতত জবাবদিহি করতে বলা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা।








